মেঘদূত।"রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানসী কাব্যের মেঘদূত কবিতাটি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের নবভাষ্য"- আলোচনা করো।
মেঘদূত।"রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানসী কাব্যের মেঘদূত কবিতাটি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের নবভাষ্য"- আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানসী (১৮৯০) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'মেঘদূত' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। কালিদাসের ধ্রুপদী সংস্কৃত কাব্য মেঘদূত-এর বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করলেও, রবীন্দ্রনাথ এখানে কেবল অনুবাদ বা অনুকরণ করেননি; বরং আপন কবিকল্পনার রঙে তাকে এক নতুন জীবন ও অর্থ প্রদান করেছেন। তাই এই কবিতাকে কালিদাসের মেঘদূতের 'নবভাষ্য' বলা সার্থক। আর সেখানে এই কবিতার-
প্রেক্ষাপট ও মূলভাবের বিবর্তনে দেখি,কালিদাসের মেঘদূত-এ যক্ষ নির্বাসিত, সে বিরহী। তার বিরহ ব্যক্তিগত এবং তার লক্ষ্য হলো প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠানো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের 'মেঘদূত' কবিতায় কবির বিরহ কেবল ব্যক্তিগত নয়, তা বিশ্বজনীন। রবীন্দ্র-মানসে এই বিরহ যেন অসীম সৌন্দর্য ও আনন্দের প্রতি মানুষের চিরন্তন আকুলতা।আসলে-
কালিদাসের যক্ষ মেঘকে অনুরোধ করছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কবি স্বয়ং মেঘের নিকটবর্তী হতে চেয়েছেন। তিনি মেঘের অবারিত স্বাধীনতার মাঝে নিজের বন্দি হৃদয়ের মুক্তি খুঁজেছেন।যেখানে-
কাব্যিক ও ভাবগত সংযোগ হলো-বিরহের বিশ্বজনীন রূপান্তর।কালিদাসের যক্ষ যেমন রামগিরি থেকে অলকাপুরীর দিকে মেঘকে পাঠাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথও সেই কাল্পনিক যাত্রাপথকে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু এখানে যক্ষ নয়, কবি নিজেই মেঘের সঙ্গী হতে চান। কবির ভাষায়-
"হে নির্জন সঙ্গী, তব নির্বাসিত চিরকারা হ’তে
তুমি কি পাবে না কভু কোনো বার্তাবহ?
তুমি কি ফিরিবে না কভু নিজ দেশে?"
আসলে এখানে কবি মেঘকে 'নির্বাসিত' বলে অভিহিত করে নিজের অন্তরের একাকীত্বকেই মেঘের ওপর আরোপ করেছেন।
কবির অসীমের প্রতি আকুলতা।কালিদাসের মেঘদূতে বিরহ মেটানোর একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্য (অলকা) আছে। কিন্তু রবীন্দ্র-মেঘদূতে বিরহ এক অসীম বেদনায় পর্যবসিত, যার কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। এটি মানুষের শাশ্বত অতৃপ্তির বহিঃপ্রকাশে আমরা দেখতে পাই-
"কোথা সে অলকা-পুরী, কোথা সে যক্ষবধূ/বিজন বিরহ-ক্লান্ত, কোথা সে অমোঘ
বর্ষার প্রথম দিন! সব গেছে মিশে/ ধূলি-ধূসরিত পথ, সব গেছে মিছে!"
রবীন্দ্রনাথ এখানে অতীত ও বর্তমানের সংযোগ ঘটিয়ে দেখিয়েছেন যে, পার্থিব মিলন নশ্বর, কিন্তু বিরহের বেদনা শাশ্বত।
আমরা জানি 'ভাষ্য' মানে হলো ব্যাখ্যা। রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের আখ্যানকে কেবল বয়ান করেননি, তার দার্শনিক অর্থ পরিবর্তন করেছেন।যেখানে-
কল্পনার স্বাধীনতায় কালিদাসের যক্ষ যেখানে বন্দি, সেখানে রবীন্দ্রনাথের কবি মেঘের মাধ্যমে দেশ-কাল-পাত্রের সীমানা অতিক্রম করতে চান।শুধু তাই নয়-
প্রকৃতি ও মানবের মিলনে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে কেবল পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং প্রকৃতিকেই কবির বিরহের পরিপূরক করে তুলেছেন। মেঘ এখানে কেবল বাহক নয়, মেঘ এখানে কবির আত্মার প্রতীক। তাই এই কবিতায় উঠে এসেছে-
আবেগঘন সুর। কালিদাসের কাব্যে বিরহের যে করুণ রস (Pathos) আছে, রবীন্দ্রনাথ তাকে আধুনিক রোমান্টিকতার স্পর্শে আরও গভীর ও অতলস্পর্শী করে তুলেছেন। আর ঠিক তখনই এ কবির কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই-
"আমি শুধু চাহি পথ, চাহি মুক্ত দ্বার,/ চাহি আমি ওই সুদূর নীলিমার পানে/যেথা তুমি চলে যাও— একা, নিঃসঙ্গ, উদাসীন।"
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথের 'মেঘদূত' কবিতাটি কালিদাসের মূল কাব্যের একটি সৃজনশীল পুনর্বিন্যাস। তিনি প্রাচীন ধ্রুপদী সাহিত্যের কাঠামোকে গ্রহণ করেও তাতে আধুনিক মানবমনের সংশয়, অতৃপ্তি এবং অসীমের প্রতি তৃষ্ণাকে অসাধারণ শৈল্পিকতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই এই কবিতাটি কালিদাসের মেঘদূতের নিছক অনুসৃতি নয়, বরং এক নতুন নান্দনিক ও দার্শনিক ভাষ্য, যা পাঠককে বিরহের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir
Comments
Post a Comment