ওরা কাজ করে।"জয়োধ্বত প্রবল সাম্রাজ্যবাদীরা মানব ইতিহাস রচনা করেন না, করেন কর্মমুখর চলমান জনতা"-ওরা কাজ করে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সত্য কিভাবে উপস্থাপিত করেছেন তা আলোচনা করো।
ওরা কাজ করে।"জয়োধ্বত প্রবল সাম্রাজ্যবাদীরা মানব ইতিহাস রচনা করেন না, করেন কর্মমুখর চলমান জনতা"-ওরা কাজ করে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সত্য কিভাবে উপস্থাপিত করেছেন তা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরোগ্য কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'ওরা কাজ করে' কবিতাটি ইতিহাস ও সভ্যতার এক গভীর দার্শনিক ভাষ্য। এই কবিতায় কবি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, সাম্রাজ্যবাদের দম্ভ বা যুদ্ধের উন্মাদনা ইতিহাসের নির্মাতা নয়; প্রকৃত ইতিহাস রচনা করেন শ্রমজীবী কর্মমুখর সাধারণ জনতা। আসলে 'ওরা কাজ করে' কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বনাম জনশক্তির দ্বন্দ্ব। যেখানে-
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যচেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মানবতাবাদী দর্শন। তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে রচিত 'ওরা কাজ করে' কবিতায় তিনি ইতিহাসকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছেন। কবি মহাশূন্যের উদাসীন পটভূমিতে দাঁড়িয়ে দেখেছেন, যুগ যুগান্তর ধরে কীভাবে রাজশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদীরা এসেছে আর ধুলোয় মিশে গেছে, অথচ তাদের পদতলে পিষ্ট হয়েও সাধারণ মানুষ চিরকাল তাদের সৃজনশীল কর্মপ্রবাহ বজায় রেখেছে। শুধু তাই নয় , ওরা কাজ করে কবিতায় দেখানো হয়েছে-
সাম্রাজ্যবাদের নশ্বরতা ও দম্ভের পতন।যেখানে কবিতার প্রথমার্ধে কবি মহাশূন্যের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের অসারতা তুলে ধরেছেন। অতীতে পাঠান, মোগল বা সমসাময়িক শক্তিশালী ইংরেজ-প্রত্যেকেই এসেছিল ‘জয়োদ্ধত’ দম্ভ নিয়ে। তাদের বিজয় রথের চাকায় ধুলোর জাল উড়েছে, আকাশে পতাকার দাপট ছিল। কিন্তু কবি গভীর উপলব্ধিতে দেখেছেন-
"শূন্যপথে চাই, আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।"
আসলে সাম্রাজ্যবাদীরা ইতিহাসকে নিজেদের আজ্ঞাবহ করতে চেয়েছিল, যুদ্ধের রক্তপাত দিয়ে নিজেদের নাম খোদাই করতে চেয়েছিল। কবি ব্যঙ্গ করে বলেছেন, সেই সব জয়স্তম্ভ আজ ‘মূঢ়সম’ অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের রক্তমাখা বিজয়গাঁথা কেবল শিশুর পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকে, বাস্তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই।তবে-
জনতাই হলো প্রকৃত ইতিহাস নির্মাতা।আর কবিতার দ্বিতীয় অংশে কবি দৃষ্টি ফিরিয়ে আনেন মাটির পৃথিবীর দিকে। এখানেই তিনি খুঁজে পান ইতিহাসের প্রকৃত কারিগরদের। সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে যারা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে, তারা কোনো বিশাল রাজমুকুটধারী বীর নয়, বরং ‘বিপুল জনতা’। কবি এদের 'ওরা' বলে সম্বোধন করেছেন, কারণ সমাজে এদের পরিচয় উপেক্ষিত। কিন্তু এদের কাজের মাধ্যমেই সভ্যতার চাকা সচল থাকে। তাই কবিকণ্ঠে আমরা শুনতে পাই-
"ওরা চিরকাল টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল;
ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ওরা কাজ করে নগরে প্রান্তরে।"
এই জনতা কোনো ব্যক্তিগত খ্যাতির মোহে আচ্ছন্ন নয়, তারা ‘মানুষের নিত্য প্রয়োজনে’ কাজ করে যায়। জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখের দৈনন্দিনতাকে সঙ্গী করেই তারা সভ্যতার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। সভ্যতার সেই ভিত্তি পুস্তরে আমরা দেখতে পাই-
কর্মের মহামন্ত্র।কবি দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য, কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের কর্মপ্রবাহ প্রবাহমান। রাজছত্র ভেঙে পড়ে, রণডঙ্কার শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাজের ‘গুন্ গুন্ স্বর’ দিনযাত্রাকে মুখর করে তোলে।তাই কবি লিখেছেন-
"শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-’পরে ওরা কাজ করে।"
এখানেই কবি মূল সত্যটি স্থাপন করেছেন-ক্ষমতার দম্ভ বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের সৃজনশীল শ্রম, যা মাটি খুঁড়ে শস্য ফলায় বা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তা-ই শাশ্বত ইতিহাস। এই কর্মই হলো জীবনের ‘মহামন্ত্র’।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, রবীন্দ্রনাথ এখানে ইতিহাসকে শাসকবর্গের ক্ষমতার মাপকাঠি থেকে মুক্ত করে গণমানুষের শ্রমের মাপকাঠিতে বিচার করেছেন। সাম্রাজ্যবাদীরা কেবল ধ্বংস বা সাময়িক আধিপত্য সৃষ্টি করে, আর কর্মমুখর জনতা সৃষ্টি করে সভ্যতা।তাই ইতিহাসের প্রকৃত রচয়িতা তারাই, যারা মাটির পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে নিরন্তর কাজ করে যায়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir
Comments
Post a Comment