চার্বাকরা কেন 'শব্দ' প্রমাণকে স্বীকার করেন না? বিস্তারিত আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ভারতীয় দর্শনে জ্ঞান অর্জনের জন্য যে মাধ্যমগুলো স্বীকৃত, তাদের 'প্রমাণ' বলা হয়। চার্বাক দর্শন একটি জড়বাদী ও প্রত্যক্ষবাদী দর্শন। তাঁরা 'প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ'-এই নীতিতে বিশ্বাসী। ভারতীয় দর্শনের অন্য শাখাগুলোতে (যেমন—ন্যায় বা মীমাংসা দর্শনে) 'শব্দ' বা আপ্তবাক্যকে স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করা হলেও, চার্বাকরা একে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, শব্দ প্রমাণের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। আর এই পরিপ্রেক্ষিতে চার্বাকরা বলেন-
১) অনুমানের ওপর নির্ভরশীলতা।শব্দ প্রমাণ বা আপ্তবাক্য গ্রহণ করার অর্থ হলো বক্তার সততা বা বিশ্বস্ততার ওপর বিশ্বাস রাখা। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যে 'আপ্ত' বা 'বিশ্বস্ত', তা আমরা কীভাবে জানি? চার্বাকদের মতে, এটি আমরা আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে 'অনুমান' করে নিই। যেহেতু চার্বাকরা অনুমানকেই একটি স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে মানেন না, তাই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত শব্দকেও তাঁরা প্রমাণ হিসেবে মানতে পারেন না।
২)পরোক্ষ জ্ঞানের অসারতা।চার্বাকরা মনে করেন, যথার্থ জ্ঞান কেবল ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের প্রত্যক্ষ সংযোগের মাধ্যমেই সম্ভব। শব্দ বা আপ্তবাক্য আমাদের এমন অনেক বিষয়ে জ্ঞান দেওয়ার দাবি করে, যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের অগোচর (যেমন—ঈশ্বর, আত্মা, পরলোক বা স্বর্গ)। যা প্রত্যক্ষ করা যায় না, চার্বাকদের মতে তার অস্তিত্বই নেই। সুতরাং, প্রত্যক্ষের সীমার বাইরের কোনো বিষয়ে শব্দ প্রমাণ অসার।
৩)বেদ ও ধর্মশাস্ত্রের সমালোচনা।ভারতীয় দর্শনে শব্দ প্রমাণের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো বেদ। চার্বাকরা বেদকে অভ্রান্ত মনে করেন না। তাঁদের মতে, বেদ হলো ভণ্ড পুরোহিতদের সৃষ্টি। বেদ রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ধর্মভয়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করা। চার্বাকদের ভাষায়—
- "অগ্নিহোত্রং ত্রয়ো বেদাস্ত্রিদণ্ডং ভস্মগুণ্ঠনম্।বুদ্ধিপৌরুষহীনানাং জীবিকা ধাতুনির্মিতা॥"
অর্থাৎ, অগ্নিহোত্র, তিন বেদ, ত্রিদণ্ড ধারণ—এসবই হলো বুদ্ধিহীন ও পুরুষকারহীন মানুষদের জীবিকার উপায় মাত্র।
৪) তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের অভাব।প্রত্যক্ষ জ্ঞানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার নিশ্চয়তা। কিন্তু শব্দের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান অনেক সময় ভ্রান্ত বা অতিরঞ্জিত হতে পারে। শব্দপ্রমাণের ক্ষেত্রে বক্তার ব্যক্তিগত পক্ষপাত বা ভ্রান্তি থাকার সম্ভাবনা থাকে। প্রত্যক্ষের মতো এখানে সরাসরি যাচাইয়ের কোনো উপায় নেই বলেই চার্বাকরা একে প্রমাণের মর্যাদা দিতে নারাজ।
পরিশেষে বলা যায় যে, চার্বাকরা তাঁদের প্রত্যক্ষবাদী দর্শনের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই শব্দ প্রমাণকে খণ্ডন করেছেন। তাঁদের মতে, জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো অলৌকিক বা পরোক্ষ মাধ্যম প্রয়োজন নেই; যা প্রত্যক্ষগোচর নয়, তা সত্য নয়। এই কঠোর যুক্তিবাদই চার্বাক দর্শনকে ভারতীয় দর্শনের ধারায় এক অনন্য ও প্রতিবাদী অবস্থান দিয়েছে, যা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও বিচারবুদ্ধিকে প্রাধান্য দেয়।
Comments
Post a Comment