টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।
টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।
আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।
১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ 'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন-
"পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"
আসলে জনশ্রুতি অনুযায়ী, আরব্য বণিক ও পাঞ্জাবের উষ্ট্রচালকেরা মরুভূমিতে চলার সময় এক ধরণের দ্রুত কম্পনযুক্ত সুর করে গান গাইতেন। অযোধ্যার নবাব আসফ-উদ-দৌলার দরবারের বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ গোলাম নবী (ওরফে শোরী মিঞা) এই লোকগানটিকে প্রথম রাগসংগীতের কাঠামোয় এনে 'হিন্দুস্থানি টপ্পা' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে রামনিধি গুপ্ত এই হিন্দুস্থানি টপ্পার আদলে বাংলা টপ্পা গানের প্রবর্তন করেন।
২. বাংলা টপ্পা গানের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ-বাংলা টপ্পা গান তৎকালীন অন্যান্য গান (যেমন কবিগান বা পাঁচালী) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-
•আকার ও গঠনে সংক্ষিপ্ততাঃ ধ্রুপদ বা খেয়াল গানের মতো টপ্পা গানের বিস্তার দীর্ঘ নয়। এটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং সাধারণত দুটি তুক বা চরণে (স্থায়ী ও অন্তরা) সীমাবদ্ধ থাকে।
•তানের চমৎকারিত্বঃ টপ্পা গানের মূল প্রাণ হলো এর দ্রুত ও সূক্ষ্ম তান। গলার স্বরকে কাঁপিয়ে এক ধরণের বিশেষ অলংকার তৈরি করা হয়, যাকে সংগীতে 'গিটকিরি' বা 'জমজমা' বলা হয়। স্বরের এই দ্রুত আরোহন-অবরোহনের ফলে গানটিতে একটি চটুল ও প্রবহমান গতি তৈরি হয়।
•রাগ ও তালের পরিমিত ব্যবহারঃ টপ্পা গান মূলত খাম্বাজ, ভৈরবী, সিন্ধু, কাফি, ঝিঁঝিট ও বেহাগ রাগে গাওয়া হতো। গম্ভীর রাগের চেয়ে চটুল ও কোমল রাগে এর চলন ভালো। এতে সাধারণত 'পাঞ্জাবি মধ্যমান', 'যৎ' বা 'তেতালা' তাল ব্যবহৃত হতো।
•লৌকিক ও মানবীয় প্রেমঃ টপ্পা গানের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো—এতে রাধাকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক প্রেমের চেয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের লৌকিক ও ইহজাগতিক প্রেম-বিরহ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
•কোমল গায়নশৈলীঃ হিন্দুস্থানি টপ্পার তানে যে তীব্র ক্ষিপ্রতা বা কর্কশ ভাব ছিল, বাংলা টপ্পায় তা বর্জন করা হয়। বাঙালির আবেগ ও ভাষার সাথে সংগতি রেখে নিধুবাবু একে অনেক বেশি পেলব, মন্থর এবং মধুর করে তোলেন।
৩. বাংলা টপ্পা গানে নিধুবাবুর (রামনিধি গুপ্ত) অবদান
বাংলা টপ্পা গানকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ দান করার পেছনে রামনিধি গুপ্তের (১৭৪১-১৮৩৯) অবদান একক এবং অতুলনীয়। তাঁর অবদানকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা যায়। আর সেই আলোচনায় আমরা দেখতে পাই যে-
ক) রুচি ও আঙ্গিকের আধুনিকীকরণঃ নিধুবাবুর পূর্বে বাংলায় যে ধরণের টপ্পা বা আখড়াই গান প্রচলিত ছিল, তার ভাষা ও রুচি ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট। নিধুবাবু ছাপরায় ওকালতি ও চাকুরির সূত্রে একজন মুসলিম ওস্তাদের কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতের শিক্ষা নেন এবং শোরী মিঞার টপ্পার সাথে পরিচিত হন। কলকাতায় ফিরে ১৮০৪ সালে তিনি একটি সংগীতের আখড়া স্থাপন করেন। তিনি টপ্পা গানকে সস্তা আমোদ-প্রমোদের স্তর থেকে তুলে এনে বাবু কলকাতার বৈঠকখানায় ভদ্র, মার্জিত ও উচ্চাঙ্গসংগীতের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।
খ) 'কানু বিনে গীত নাই' প্রথার অবসান ও মানবীয় প্রেমের প্রাধাধ্যঃ নিধুবাবুর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক কৃতিত্ব হলো তিনি বাংলা গানকে রাধাকৃষ্ণের ধর্মীয় রূপক থেকে মুক্ত করেন। তিনিই প্রথম খাঁটি মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ইহজাগতিক প্রেমকে গানের মূল বিষয়বস্তু করেন। তাঁর গানে শরীরী লালসার চেয়ে মনের যাতনা ও আকুলতা মুখ্য হয়ে উঠেছে। আর সেখানে তাঁর একটি বিখ্যাত গান শুনতে পাই-
"ভালবাসবে বলি ভালবাসিনে, / আমার স্বভাব এই, তোমা বই আর জানিনে।"
গ) প্রথম স্বাদেশিকতার সুর ও ভাষাপ্রীতিঃ নিধুবাবু শুধু প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম স্বাদেশিক সংগীতের রচয়িতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন ইংরেজি শিক্ষার জোয়ারে বাঙালি নিজের ভাষা ভুলতে বসেছিল, তখন তিনি মাতৃভাষার জয়গান গেয়ে যে লিখেছিলেন-
"নানান দেশের নানান ভাষা / বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা?"
এই একটিমাত্র চরণের জন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্বরচিত গানের সংকলন 'গীতিরত্ন'(১৮৩৭) প্রকাশিত হয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, নিধুবাবুর হাত ধরে বাংলা গান মধ্যযুগীয় দেব-আরাধনার গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক যুগের লিরিক বা গীতিকবিতার রূপ পরিগ্রহ করে। তাঁর টপ্পা গানের এই পেলব রোমান্টিক কাঠামোটি পরবর্তীকালে শ্রীধর কথক, কালী মীর্জা হয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু গানে (যেমন: "হল না হল না সই, হায় / মরমে মরমে লুকানো রহিল")- গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাই বাংলা সংগীত ও সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে টপ্পা গানের প্রবর্তক হিসেবে নিধুবাবুর স্থান অনন্য।
ঠিক এরূপ অস়ংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা,সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundorbon YouTube channel SAMARESH SIR
Comments
Post a Comment