Skip to main content

 বায়ুমন্ডলের উষ্ণতার তারতম্যের কারণ লেখো।




বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্থানে এবং সময়ে উষ্ণতা একরকম থাকে না; স্থান, কাল ও অঞ্চলভেদে এর যথেষ্ট তারতম্য দেখা যায়। বায়ুমণ্ডলের এই উষ্ণতার তারতম্যের প্রধান কারণসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:

## ১. সূর্যরশ্মির পতনকোণ

উষ্ণতার তারতম্যের প্রধান কারণ হলো সূর্যরশ্মির পতনকোণ।

 * **নিরক্ষীয় অঞ্চলে** সূর্য সারা বছর প্রায় লম্বভাবে কিরণ দেয়, ফলে কম স্থানে বেশি তাপ পড়ে এবং বায়ুমণ্ডল বেশি উত্তপ্ত হয়।

 * **মেরু অঞ্চলের দিকে** সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ে, ফলে বেশি স্থানে আলো ছড়িয়ে পড়ে তাপের তীব্রতা কমে যায় এবং অঞ্চলটি শীতল থাকে।

## ২. অক্ষাংশ

সূর্যরশ্মির পতনকোণের ওপর নির্ভর করে অক্ষাংশের তারতম্য ঘটে। অক্ষাংশ যত বৃদ্ধি পায় (নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে), উষ্ণতা তত কমতে থাকে। নিরক্ষরেখা (0^\circ) থেকে উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর (90^\circ) দিকে গেলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ক্রমশ হ্রাস পায়।

## ৩. উচ্চতা

প্রতি ১,০০০ মিটার (বা ১ কিমি) উচ্চতা বৃদ্ধিতে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রায় **৬.৪° সেলসিয়াস** হারে হ্রাস পায়। একে *স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাসের হার* (Normal Lapse Rate) বলে।

 * বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তর ভূ-সংলগ্ন হওয়ায় ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত তাপে বেশি উত্তপ্ত হয়।

 * ওপরের দিকে বায়ুর ঘনত্ব ও তাপ ধারণক্ষমতা কম থাকায় পার্বত্য অঞ্চল সমভূমির চেয়ে বেশি শীতল হয় (যেমন: শিলিগুড়ির তুলনায় দার্জিলিং বেশি শীতল)।

## ৪. সমুদ্র থেকে দূরত্ব

জলভাগের তাপ গ্রহণ ও বর্জন করার ক্ষমতা স্থলভাগের চেয়ে অনেক ধীরগতির।

 * সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে গ্রীষ্মে বেশি গরম বা শীতের সময় বেশি ঠান্ডা পড়ে না; সেখানকার জলবায়ু **সমভাবাপন্ন** হয়।

 * সমুদ্র থেকে দূরবর্তী বা মহাদেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে গ্রীষ্মে তীব্র গরম এবং শীতে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়—একে **ভাবাপন্ন জলবায়ু** বলে।

## ৫. বায়ুপ্রবাহ

উষ্ণ অঞ্চলের ওপর দিয়ে উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হলে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা বেড়ে যায় (যেমন: ভারতে গ্রীষ্মকালে প্রবাহিত 'লূ')। আবার শীতল অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু সেখানকার তাপমাত্রা অনেক কমিয়ে দেয়।

## ৬. সমুদ্রস্রোত

সমুদ্রস্রোতের ওপর নির্ভর করেও উপকূলবর্তী এলাকার বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রিত হয়।

 * **উষ্ণ সমুদ্রস্রোত** যেসব অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানকার বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

 * **শীতল সমুদ্রস্রোত** সংলগ্ন অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলকে শীতল করে তোলে।

## ৭. ভূমির ঢাল

 * **উত্তর গোলার্ধে** নিরক্ষরেখামুখী বা দক্ষিণমুখী ঢালে সূর্যরশ্মি সোজাভাবে পড়ে, ফলে এগুলো বেশি উত্তপ্ত হয়।

 * **উত্তরমুখী ঢালে** সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ায় তুলনামূলক শীতল থাকে।

## ৮. মেঘাচ্ছন্নতা ও অবক্ষেপণ

আকাশ মেঘলা থাকলে দিনের বেলায় সূর্যরশ্মি ভূপৃষ্ঠে সরাসরি পৌঁছাতে পারে না, ফলে তাপমাত্রা কম থাকে। কিন্তু রাতে মেঘ বায়ুমণ্ডলের তাপকে মহাশূন্যে বিকিরণ হতে বাধা দেয়, ফলে রাত বেশি উষ্ণ হয়। এছাড়া বৃষ্টিপাত বা তুষারপাত হলেও বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা হ্রাস পায়।

## ৯. মৃত্তিকার প্রকৃতি ও উদ্ভিদ

 * **পলিমাটি বা ভেজা মাটি** তাপ কম শোষণ করে, কিন্তু **মরুভূমির শুষ্ক বালিমাটি** দ্রুত তাপ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলকে খুব উত্তপ্ত করে তোলে।

 * **ঘন বনভূমিযুক্ত অঞ্চলে** উদ্ভিদের প্রস্বেদনের ফলে বাষ্পীভবন বেশি হয় এবং সূর্যালোক মাটিতে পৌঁছাতে বাধা পায়, ফলে ওই অঞ্চল শীতল থাকে।

## ১০. মানবীয় বা কৃত্রিম কারণ

নগরায়ণ, শিল্পায়ন, গাছপালা কাটা এবং যানবাহনের ধোঁয়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের (যেমন: CO_2) পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পৃথিবীপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়িয়ে তুলছে (Global Warming)।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...