Skip to main content

সমাজতত্ত্বের প্রকৃতি ও পরিধি আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার সমাজবিদ্যা।


## ১. সমাজতত্ত্বের প্রকৃতি (Nature of Sociology)

সমাজতত্ত্বের প্রকৃতি বলতে বোঝায় এই বিষয়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও রূপটি কেমন। সমাজতত্ত্বকে একটি বিজ্ঞানসম্মত চর্চা হিসেবে গণ্য করা হয়। এর প্রধান প্রকৃতিগুলি নিচে দেওয়া হলো:

 * **এটি একটি সামাজিক বিজ্ঞান (Social Science):** সমাজতত্ত্ব কোনো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (যেমন পদার্থবিদ্যা বা রসায়ন) নয়, এটি একটি সামাজিক বিজ্ঞান। এটি সমাজ, মানুষের সামাজিক সম্পর্ক এবং দলগত আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।

 * **বস্তুনিষ্ঠ এবং অভিজ্ঞতাবাদী (Empirical):** সমাজতত্ত্ব কাল্পনিক কোনো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এটি বাস্তব সমাজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে (Observation) এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তা বিশ্লেষণ করে।

 * **মূল্যবোধ নিরপেক্ষ (Value-free / Categorical):** সমাজতত্ত্ব কোনো সমাজ বা আচরণ ভালো নাকি মন্দ—সেই বিচার করে না। সমাজ যেমন, ঠিক তেমনই তাকে তুলে ধরা সমাজতত্ত্বের কাজ। অর্থাৎ, এটি "কী হওয়া উচিত" তা না বলে "কী আছে" তা আলোচনা করে।

 * **বিমূর্ত বিজ্ঞান (Abstract Science):** সমাজতত্ত্ব কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা ব্যক্তির রূপ নিয়ে আটকে থাকে না। এটি সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিক গোষ্ঠী (Groups) এবং সামাজিক প্রক্রিয়ার সাধারণ নিয়মগুলি আবিষ্কার করার চেষ্টা করে।

 * **সাধারণীকরণ ধর্মী (Generalizing Science):** এটি কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ দেয় না (যা ইতিহাস করে)। বরং এটি বিভিন্ন সামাজিক ঘটনার মধ্যে সাধারণ মিল খুঁজে বের করে একটি সাধারণ সূত্র বা তত্ত্ব গঠন করার চেষ্টা করে।

## ২. সমাজতত্ত্বের পরিধি (Scope of Sociology)

समाजতত্ত্বের পরিধি বলতে বোঝায় এর আলোচনার সীমানা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে পরিধি নিয়ে প্রধানত দুটি মতবাদ বা চিন্তাধারা (Schools of Thought) লক্ষ্য করা যায়:

### ক) রসাত্মক বা বিশেষত্ববাদী মতবাদ (Formalistic or Specialistic School)

এই মতবাদের প্রবক্তা হলেন **জর্জ জিমেল (Georg Simmel)**, ম্যাক্স ভেবার, বীরকান্ট প্রমুখ।

 * তাঁদের মতে, সমাজতত্ত্বের পরিধি হওয়া উচিত সুনির্দিষ্ট এবং সীমিত।

 * সমাজতত্ত্ব সমাজের সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে না, এটি কেবল মানুষের সামাজিক সম্পর্কের **'আকার' বা 'রূপ' (Forms of Social Relationships)** নিয়ে আলোচনা করবে। যেমন—প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা, দাসত্ব, প্রভুত্ব ইত্যাদি রূপগুলি এর আলোচ্য বিষয়।

### খ) সংশ্লেষাত্মক মতবাদ (Synthetic School)

এই মতবাদের প্রবক্তা হলেন **এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim)**, মায়োহাউস, হবহাউস এবং সোরোকিন।

 * তাঁদের মতে, সমাজতত্ত্বের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। সমাজকে খণ্ডিতভাবে দেখা যায় না, কারণ সমাজের সব অংশ একে অপরের সাথে যুক্ত।

 * তাই সমাজতত্ত্বকে একটি সাধারণ সামাজিক বিজ্ঞান হতে হবে, যা সমাজের সামগ্রিক রূপ নিয়ে আলোচনা করবে।

### আধুনিক দৃষ্টিতে সমাজতত্ত্বের বাস্তব পরিধি

বর্তমানে সমাজতত্ত্বের পরিধি অত্যন্ত বিশাল। এর মধ্যে মূলত যে বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে:

১. **সামাজিক প্রতিষ্ঠান (Social Institutions):** পরিবার, বিবাহ, জ্ঞাতিসম্পর্ক (Kinship), ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনীতি—এই সমস্ত মৌলিক প্রতিষ্ঠান সমাজতত্ত্বের পরিধির মধ্যে পড়ে।

২. **সামাজিক স্তরবিন্যাস (Social Stratification):** সমাজে কীভাবে শ্রেণি, জাতি (Caste), লিঙ্গ (Gender) এবং ক্ষমতার ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভেদ ও স্তর তৈরি হয়, তা এখানে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়।

৩. **সামাজিক পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ (Social Change & Control):** সমাজ কীভাবে প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে (যেমন—নগরায়ণ, শিল্পায়ন) এবং সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখতে রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম বা লোকচার কীভাবে ভূমিকা রাখছে, তা এর অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।

৪. **সামাজিক সমস্যা (Social Problems):** অপরাধ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সংকটের মতো সমসাময়িক সামাজিক সমস্যাগুলি সমাজতত্ত্বের পরিধির অংশ।

৫. **সামাজিক প্রক্রিয়া (Social Processes):** মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা অন্তর্বর্তী প্রক্রিয়া, যেমন—সহযোগিতা (Cooperation), প্রতিযোগিতা (Competition) এবং সংঘর্ষ (Conflict) নিয়ে সমাজতত্ত্ব আলোচনা করে।

> **উপসংহার:** সংক্ষেপে বলা যায়, মানুষের সামাজিক জীবনের এমন কোনো দিক নেই যা সমাজতত্ত্বের পরিধির বাইরে। সমাজতত্ত্বের প্রকৃতি যেমন বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ, তেমনই এর পরিধি সমগ্র মানব সমাজ জুড়ে বিস্তৃত।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...