Skip to main content

রাশিয়ার চিঠি।বলশেভিক অর্থনীতি অবলম্বনে আমার মত কি , একথা অনেকে আমায় জিজ্ঞাসা করে থাকেন। রাশিয়ার চিঠিতে এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে মতামত ব্যক্ত করেছেন তা লেখো?

রাশিয়ার চিঠি।বলশেভিক অর্থনীতি অবলম্বনে আমার মত কি , একথা অনেকে আমায় জিজ্ঞাসা করে থাকেন। রাশিয়ার চিঠিতে এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে মতামত ব্যক্ত করেছেন তা লেখো? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'রাশিয়া-র চিঠি'(১৯৩০) গ্রন্থে বলশেভিক বা সোভিয়েত অর্থনীতির নীতি, সফলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে অত্যন্ত গভীর, নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ মতামত প্রকাশ করেছেন। রাশিয়ার নবগঠিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখে তিনি যেমন অভিভূত হয়েছিলেন, তেমনই এর কিছু সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করেছিলেন। সেখানে বলশেভিক অর্থনীতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মূল বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি হলো-

     •শিক্ষাপ্রসার ও সর্বসাধারণের উন্নতি।রবীন্দ্রনাথ বলশেভিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখেছেন সর্বসাধারণের সার্বিক উন্নতিকে। অল্প সময়ের মধ্যে বলশেভিক সরকার কীভাবে কোটি কোটি নিরক্ষর ও দরিদ্র মানুষকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলেছে, তা দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।তবে-

        ইতিপূর্বে যে বিপুল জনগোষ্ঠী কেবল ধনী বা শাসকশ্রেণীর সেবাতেই নিয়োজিত ছিল, বলশেভিক অর্থনীতি তাদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে এসেছে এবং সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের অধিকার সুনিশ্চিত করেছে।

      •লোভ ও ধনের ব্যক্তিগত কেন্দ্রীভবন নিরসন।কৈশোর থেকেই রবীন্দ্রনাথ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত লোভ এবং ধনবৈষম্যের বিরোধিতা করেছেন।বলশেভিক অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত মুনাফালাভ ও সম্পত্তির লোভকে দূর করার যে চেষ্টা করা হয়েছে, তাকে কবি সাধুবাদ জানিয়েছেন।তিনি মনে করতেন, অর্থ বা সম্পত্তি যখন কয়েকজনের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তখন তা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ব্যবস্থা এই শোষণের মূল উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল।

      •সমবায় বা 'কো-অপারেটিভ' ব্যবস্থা।কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে বলশেভিকদের সমবায় পদ্ধতিকে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন।কবি বিশ্বাস করতেন, এককভাবে কাজ করার চেয়ে যৌথ বা সমবায় শক্তিতে কাজ করলে সাধারণ মানুষের শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।তবে-

        রাশিয়ার যৌথ খামার ও সমবায় উৎপাদনের মডেল দেখে তিনি অভিভূত হন এবং ভারতেও এই ধরনের নীতি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

      •ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের আশঙ্কা (সতর্কবার্তা)।বলশেভিক নীতির প্রশংসার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা বা বিপদের কথা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।যেখানে -

        তিনি মনে করতেন, মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক বৈচিত্র্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রয়েছে। বলশেভিক সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে জোর করে সবাইকে এক ছাঁচে ঢালতে গিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করছে। শুধু তাই নয়-

           জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। কবি স্পষ্ট সতর্ক করেছিলেন যে, ভাবাদর্শ প্রচারের নামে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং জোর-জুলুম চালানো হয়, তবে তার পরিণতি ভালো হতে পারে না।

      পরিশেষে অবশ্যই আমাদের বলতে হয় যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, বলশেভিক অর্থনীতি মানুষের লোভ ও বৈষম্য দূর করে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষকে সুশিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে তিনি জোরপূর্বক সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের নীতিকে সমর্থন করেননি। তাঁর মতে, মানবকল্যাণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখেই কেবল এক স্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...