Skip to main content

নেপোলিয়নের পতনের জন্য মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা বা প্রথা কতটা দায়ী ছিল বিশদে আলোচনা করো।

নেপোলিয়নের পতনের জন্য মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা বা প্রথা কতটা দায়ী ছিল বিশদে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস মাইনর।

     আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভুল ছিল মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা (Continental System)। ১৮০৬ সালে বার্লিন ডিক্রি এবং ১৮০৭ সালে মিলান ডিক্রির মাধ্যমে তিনি এই প্রথা চালু করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ নৌ-শক্তি ইংল্যান্ডকে সরাসরি যুদ্ধে হারাতে না পেরে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। কিন্তু ইতিহাসবিদদের মতে, এই ব্যবস্থা ইংল্যান্ডের যতটা না ক্ষতি করেছিল, তার চেয়ে বেশি ডেকে এনেছিল খোদ নেপোলিয়নের নিজে। আর সেখানে তার পতনের কারণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই-

 ১)মারাত্মক আত্মঘাতী অর্থনৈতিক নীতিঃইংল্যান্ডকে বয়কট করতে গিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের দেশগুলো ব্রিটিশ পণ্য, বিশেষ করে সস্তা শিল্পজাত সামগ্রী এবং উপনিবেশ থেকে আসা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস (যেমন- চিনি, কফি, চা, বস্ত্র) থেকে বঞ্চিত হয়। ফ্রান্সের শিল্পকারখানাগুলো এই বিপুল চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ফলে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং পণ্যের অভাব দেখা দেয়, যা সাধারণ মানুষের মনে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে চরম অসন্তোষ তৈরি করে।

২) 'স্পেনীয় ক্ষত' (Peninsular War) এবং পর্তুগাল আক্রমণঃব্রিটেনের দীর্ঘদিনের মিত্র পর্তুগাল এই অবরোধ প্রথা মানতে অস্বীকার করে। পর্তুগালকে শাস্তি দিতে এবং জোরপূর্বক এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে ১৮০৭ সালে নেপোলিয়ন স্পেনের ওপর দিয়ে সৈন্য পাঠান। এর ফলে স্পেনের জনগণের তীব্র প্রতিরোধের মুখে শুরু হয় উপদ্বীপের যুদ্ধ।এই যুদ্ধে স্পেনের গেরিলা বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী ফরাসি বাহিনীকে বছরের পর বছর ব্যস্ত রাখে। সেখানে-

 নেপোলিয়ন নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, এই "স্পেনীয় ক্ষত" তার শক্তি ও সম্পদ উধাও করে দিয়েছিল।

৩)রাশিয়ার অভিযান ও ফরাসি সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকঃরাশিয়ার অর্থনীতি মূলত ইংল্যান্ডে শস্য ও কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। মহাদেশীয় প্রথার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হলে ১৮১০ সালে জার প্রথম আলেকজান্ডার এই প্রথা অমান্য করে ব্রিটেনের সাথে পুনরায় বাণিজ্য শুরু করেন।

        ক্ষুব্ধ নেপোলিয়ন রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে ১৮১২ সালে তার বিখ্যাত 'গ্র্যান্ড আর্মি' (Grand Army) নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন। রাশিয়ার তীব্র শীত এবং রুশ বাহিনীর "পোড়ামাটি নীতি" (Scorched Earth Policy)-র মুখে পড়ে নেপোলিয়নের বিশাল বাহিনীর প্রায় ৫ লক্ষাধিক সেনা প্রাণ হারায়। এই ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থাপনাই তার সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে।

৪)ব্যাপক চোরাচালান এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাঃসমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোতে ব্রিটিশ পণ্যের চাহিদা এতই বেশি ছিল যে ওলন্দাজ, ইতালীয় ও ফরাসি ব্যবসায়ীরা স্বয়ং এই অবরোধ ভেঙে চোরাচালান শুরু করে। এমনকি নেপোলিয়নের নিজের ভাই লুই বোনাপার্ট (যিনি হল্যান্ডের শাসক ছিলেন) জনগণের কষ্টের কথা চিন্তা করে এই প্রথা শিথিল করেছিলেন। এই চোরাচালান বন্ধ করতে গিয়ে নেপোলিয়নকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সেনা নিয়োজিত করতে হয়েছিল, যা তার সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।

৫)মিত্রদের অসন্তোষ ও জাতীয়তাবাদের উত্থানঃএই জোরজুলুমের ব্যবস্থা ইউরোপের অন্যান্য রাজশক্তি এবং সাধারণ মানুষের চোখে নেপোলিয়নকে একজন 'ত্রাতা' থেকে 'অত্যাচারী শাসক'-এ পরিণত করে। ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে (বিশেষ করে জার্মানি ও ইতালিতে) তীব্র দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে, যা পরবর্তীকালে নেপোলিয়ন-বিরোধী চতুর্থ ও পঞ্চম জোট গঠনে সাহায্য করেছিল।ইতিহাসবিদ ডেভিড থমসনের মতে-

"মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা নেপোলিয়নের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবেরই প্রমাণ। তিনি বুঝতে পারেননি যে, সমুদ্রের ওপর আধিপত্য না থাকলে কেবল স্থলভাগের ডিক্রি জারি করে একটি দ্বীপ রাষ্ট্রকে অবরুদ্ধ করা অসম্ভব।"

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,নেপোলিয়নের পতনের পেছনে কোনো একটি একক কারণ দায়ী না থাকলেও, মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা ছিল সেই মূল চালিকাশক্তি, যা তাকে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত (যেমন স্পেন ও রাশিয়া আক্রমণ) নিতে বাধ্য করেছিল। তাই তার সাম্রাজ্য ধ্বংসের পেছনে এই ব্যবস্থার দায় অপরিসীম।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...