Skip to main content

ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ কিভাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তার কি পরিণত হয়েছিল আলোচনা করো।

ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ কিভাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তার কি পরিণত হয়েছিল আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।

      আমরা জানি যে,১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব কেবল ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল সমগ্র ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের সূচনা। ফরাসি বিপ্লবের প্রধান তিনটি মূল আদর্শ-"স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী" (Liberty, Equality, Fraternity) অত্যন্ত দ্রুত ফ্রান্সের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয়।

    ১)  ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ছড়ানোর মাধ্যমসমূহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই বৈপ্লবিক আদর্শ মূলত নিম্নলিখিত উপায়ে বা মাধ্যমের সাহায্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। যারফলে-

     ক) ফরাসি বিপ্লবী সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ও 'মুক্তির ঘোষণাঃ১৭৯২ সাল থেকে ফরাসি বিপ্লবী সরকার ইউরোপের অন্যান্য রাজতান্ত্রিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফরাসি বাহিনী যেখানেই গেছে, তারা নিজেদের "মুক্তিদাতা" হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিপ্লবী কনভেনশন ডিক্রি জারি করে জানায় যে, ফ্রান্স যেকোনো দেশের উৎপীড়িত জনগণকে রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের হাত থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করবে। ফলে বেলজিয়াম, হল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির সাধারণ মানুষ ফরাসি সেনাকে স্বাগত জানায়।

   খ) নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য বিস্তার ও প্রশাসনিক সংস্কারঃ ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ইউরোপে ছড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। ঐতিহাসিক ফিশারের মতে, নেপোলিয়ন ছিলেন **"ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসা বিপ্লব"। অতঃপর-

      নেপোলিয়নীয় কোডঃ নেপোলিয়ন বিজিত অঞ্চলগুলিতে (যেমন: ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড) তাঁর আইন সংহিতা বা 'কোড নেপোলিয়ন' চালু করেন। এর ফলে আইনের চোখে সমতা প্রতিষ্ঠা হয় এবং জন্মগত সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হয়।

      সামন্ততন্ত্রের বিলোপঃ বিজিত জার্মান রাজ্যসমূহ (রাইন কনফেডারেশন) এবং ইতালিতে তিনি সামন্ততান্ত্রিক কর, দাসপ্রথা ও যাজকদের বিশেষ অধিকারের অবসান ঘটান।

গ) ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী ও যুবসমাজের উৎসাহঃ ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও স্বাধীনতার বাণী ইউরোপের মননশীল সমাজকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। ইংল্যান্ডের কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, সাউদি এবং জার্মানির দার্শনিক কান্ট, ফিকটে, হেগেল প্রমুখ এই বিপ্লবকে স্বাগত জানান। এছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে (যেমন আয়ারল্যান্ড বা ইতালিতে) গোপন বিপ্লবী ক্লাব ও যুব সংগঠন গড়ে ওঠে যা ফরাসি আদর্শের প্রচার চালায়।

    ২)ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের পরিণতি ও প্রভাবঃইউরোপীয় রাজনীতি ও সমাজে এই আদর্শের বিস্তার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং বৈপ্লবিক পরিণতির জন্ম দিয়েছিল। যারফলে ঘটে-

      সামন্ততন্ত্রের পতনঃ ইউরোপের সিংহভাগ দেশ থেকে মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক প্রথার বিলোপ ঘটে। ভূমিদাসরা মুক্তি পায় এবং কৃষকদের ওপর থেকে অন্যায্য কর তুলে নেওয়া হয়।

      জাতীয়তাবাদের উদ্রেকঃ ফরাসি বিজয়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে (যেমন স্পেন, জার্মানি ও রাশিয়া) তীব্র দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। পরবর্তীতে এটি ইতালি ও জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে রূপ নেয়। 

     গণতন্ত্র ও উদারনীতিবাদঃরাজাদের 'ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্ব' ধাক্কা খায়। সংবিধান মেনে দেশ চালানো এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের দাবি ইউরোপজুড়ে জোরালো হয়ে ওঠে। 

      আইনের অনুশাসনঃ নেপোলিয়নের শাসন সংস্কারের ফলে ইউরোপের বিচারব্যবস্থায় সাম্য ও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ আইনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। 

      ৩) প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান ও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতঃ বিপ্লবের এই জয়যাত্রার সমান্তরালে ইউরোপে এক তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল পরিবেশও তৈরি হয়েছিল। যেখানে ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপের রক্ষণশীল রাজন্যবর্গ ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শকে চাপা দিতে সচেষ্ট হন। অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিক ইউরোপে প্রাক-বিপ্লব যুগের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য দমনমূলক নীতি (মেটারনিক তন্ত্র) গ্রহণ করেন।আবার-

      ১৮৩০ ও ১৮৪৮-এর বিপ্লবঃ মেটারনিকের দমন নীতি কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গকে পুরোপুরি নেভাতে পারেনি। ফরাসি বিপ্লবের রোপণ করা উদারনীতি ও জাতীয়তাবাদের বীজ থেকেই পরবর্তীতে ইউরোপে ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লব এবং ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব (যাকে 'রাজ্যসমূহের বসন্ত' বা Spring of Nations বলা হয়) সংঘটিত হয়।

      পরিশেষে বলা যায় যে, ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। যদিও সাময়িকভাবে ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে রক্ষণশীল শক্তি ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইউরোপের সাধারণ মানুষের মন থেকে স্বাধীনতা ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এই আদর্শই ১৯ শতকে ইউরোপে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠন এবং গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট ও Shesher kabita Sundarbon youtube Channel 🙏

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...