উৎপল দত্ত।রাজনৈতিক নাটক রচনায় উৎপল দত্তের অবদান আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।
আমরা জানি যে,বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নাটক রচনা ও মঞ্চায়নে উৎপল দত্ত এক অনন্য ও অবিসংবাদিত নাম। তিনি কেবল নাটক লিখতেন না, নাটককে ভাবতেন শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এবং সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। তাঁর মতে, থিয়েটার কোনো নিষ্ক্রিয় বিনোদন নয়, বরং তা হলো "শ্রেণি সংগ্রামের এক সুতীক্ষ্ণ অস্ত্র"।আর সেই আলোকেই নিচে তাঁর রাজনৈতিক নাট্যপ্রতিভার মূল দিকগুলো আলোচনা করা হলো।
•গণমুখী থিয়েটার ও রাজনৈতিক মতাদর্শ।উৎপল দত্ত ছিলেন কট্টর মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। ১৯৪০-এর দশকে 'গণনাট্য সংঘ'এর মাধ্যমে তাঁর নাট্যজীবনের শুরু এবং পরবর্তীতে নিজের নাট্যদল 'লিটল থিয়েটার গ্রুপ' ও 'পিপলস লিটল থিয়েটার' এর মাধ্যমে তিনি বাংলা থিয়েটারকে ড্রয়িংরুমের বুর্জোয়া পরিমণ্ডল থেকে বের করে এনে সরাসরি মেহনতি মানুষের রাজনীতির সাথে যুক্ত করেন।
•উৎপল দত্তের রাজনৈতিক নাটকের শ্রেণিবিন্যাস।তাঁর রচিত রাজনৈতিক নাটকগুলোকে মূলত তিনটি প্রধান ধারায় ভাগ করে আলোচনা করা যায়:
ক) সমকালীন ও জ্বলন্ত রাজনৈতিক সংকটঃতৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতাকে তিনি সরাসরি নাটকের বিষয়বস্তু করেছেন।যেখানে 'নবান্ন' (পুনর্নির্মাণ/মঞ্চায়ন): গণনাট্যের যুগে বিজন ভট্টাচার্যের এই নাটকটির সফল প্রযোজনা দিয়ে তিনি গ্রামীণ বাংলার দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক শোষণের চিত্র তুলে ধরেন।
'লৌহমানব' ও 'দুঃস্বপ্নের নগরী'।সমকালীন রাজনৈতিক হিংসা, নকশাল আন্দোলন পরবর্তী পরিস্থিতি এবং পুঁজিপতি ও পুলিশি ব্যবস্থার আঁতাতকে তিনি তীব্রভাবে আক্রমণ করেন এই নাটকগুলোতে।
•ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য রাজনৈতিক নাটক ইতিহাসের পাতা থেকে চরিত্র ও ঘটনা তুলে এনে উৎপল দত্ত সমকালীন রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।
কল্লোল' (১৯৬৫),১৯৪৬ সালের রাজকীয় ভারতীয় নৌবাহিনীর বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত এই নাটকটি বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক মাইলফলক। তৎকালীন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আপসকামী রাজনীতির বিপরীতে নৌসেনাদের বৈপ্লবিক চেতনাকে তিনি এখানে মহিমান্বিত করেন।
'ব্যারিকেড' (১৯৭৫),জার্মানির ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং হিটলারের ক্ষমতাদখলের পটভূমিতে রচিত হলেও, এর আসল লক্ষ্য ছিল সমকালীন ভারতের জরুরি অবস্থা (Emergency) ও স্বৈরাচারী শাসনের দিকে আঙুল তোলা।
'টিনের তলোয়ার' (১৯৭১), ঊনবিংশ শতাব্দীর উনিশ শতকী সাধারণ রঙ্গালয়ের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও, এটি আসলে শিল্পীর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কথাই বলে। ব্রিটিশদের জারি করা 'নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন' (Dramatic Performances Act, 1876)-এর বিরুদ্ধে এটি ছিল এক জোরালো প্রতিবাদ।
• কৃষি ও কৃষক আন্দোলন ভিত্তিক নাটক।'তীর' (১৯৬৭)। নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে এবং গ্রামীণ জোতদার-জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে এই নাটকটি রচিত হয়।
• আঙ্গিক ও মঞ্চশৈলীর অভিনবত্ব।রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি নাটকের নান্দনিক ও শৈল্পিক দিকটিতে উৎপল দত্ত কখনোই আপস করেননি। এপিক থিয়েটারের প্রভাব, ব্রেখটের'এপিক থিয়েটার' এবং 'এলিয়েনেশন এফেক্ট' -কে তিনি দেশীয় বাস্তবতায় চমৎকারভাবে প্রয়োগ করেছিলেন।
বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চসজ্জা, 'কল্লোল' নাটকে মঞ্চের ওপর আস্ত যুদ্ধজাহাজ তৈরির যে কুশলতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা দর্শকদের রাজনৈতিকভাবে সজাগ করার পাশাপাশি এক অভূতপূর্ব থিয়েটারিক অভিজ্ঞতা দিয়েছিল।
•পথ নাটিকা ও 'স্ট্রিট থিয়েটার'।শহুরে মধ্যবিত্ত মঞ্চের বাইরে গিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য উৎপল দত্ত বহু রাজনৈতিক পথনাটিকা (যেমন: 'দিনবদল', 'স্পার্টাকাস') রচনা ও অভিনয় করেন। মিলের গেটে, চটের মাঠে বা রাজনৈতিক জনসভায় এই নাটকগুলো তৎক্ষণাৎ গণজাগরণ ঘটাতে সাহায্য করত।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,উৎপল দত্তের রাজনৈতিক নাটকগুলো কেবল তত্ত্বকথা বা স্লোগান ছিল না, তা ছিল প্রখর শিল্পগুণ ও তীক্ষ্ণ সংলাপে সমৃদ্ধ। শাসকশ্রেণীর রক্তচক্ষু ও কারাবরণ উপেক্ষা করেও তিনি আজীবন থিয়েটারকে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন। বাংলা নাটকে এই আপসহীন রাজনৈতিক চেতনার প্রসারে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
Comments
Post a Comment