Skip to main content

চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের আদি কবি হিসেবে বৃন্দাবন দাসের বিস্তারিত কৃতিত্ব আলোচনা করো।

চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের আদি কবি হিসেবে বৃন্দাবন দাসের বিস্তারিত কৃতিত্ব আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার, বাংলা মেজর ইউনিট ৪।

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের আদি পথপ্রদর্শক হিসেবে বৃন্দাবন দাসের অবদান বহুমুখী। বাংলা চৈতন্যজীবনী সাহিত্যে  আবির্ভাব এক যুগান্তকারী ঘটনা। চৈতন্যদেবের মহিমান্বিত জীবন ও আদর্শকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে যে নতুন ধারার সূচনা হয়, তা-ই 'চৈতন্য জীবনী সাহিত্য' নামে পরিচিত।তবে-

         এই ধারায় প্রথম ও শ্রেষ্ঠ আদি কবি হলেন বৃন্দাবন দাস। তাঁর রচিত 'চৈতন্যভাগবত' (পূর্বনাম: 'চৈতন্যমঙ্গল') বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সম্পূর্ণ চৈতন্য জীবনীকাব্য। কবি নিজে শ্রীচৈতন্যদেবকে সরাসরি না দেখলেও, চৈতন্য-পরিকরদের সাহচর্যে এসে তিনি এই অনন্য গ্রন্থটি রচনা করেন। আর সেখানে আমরা দেখি-

       •প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা জীবনীকাব্যের স্রষ্টা বৃন্দাবন দাস। বৃন্দাবন দাসের পূর্বে সংস্কৃতে মুরারি গুপ্ত বা স্বরূপ দামোদর কড়চা (সংক্ষিপ্ত ডায়েরি বা বিবরণী) লিখলেও, বাংলা ভাষায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে সম্পূর্ণ একটি জীবনীকাব্য রচনার সাহস ও কৃতিত্ব প্রথম দেখান বৃন্দাবন দাস। তাঁর এই সফল প্রচেষ্টাই পরবর্তীকালে লোচন দাস, জয়ানন্দ এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজকে বাংলা ভাষায় চৈতন্যচরিত লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। শুধুমাত্র তাই নয়-

     •প্রত্যক্ষ সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা (তথ্যসূত্র ও সত্যনিষ্ঠা)।বৃন্দাবন দাস নিজে চৈতন্যদেবকে সশরীরে না দেখলেও তাঁর সংগৃহীত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ছিল একশো শতাংশ নিখুঁত। আর সেই নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে আমরা পাই-

      • পারিবারিক সূত্রঃ তাঁর মাতা নারায়ণী দেবী ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেবের অত্যন্ত প্রিয় পার্ষদ শ্রীবাস পণ্ডিতের ভ্রাতুষ্পুত্রী। বাল্যকালে নারায়ণী দেবী চৈতন্যদেবের স্নেহধন্য হয়েছিলেন। ফলে মায়ের কাছ থেকে বৃন্দাবন দাস চৈতন্যদেবের বহু ঘরোয়া ও অন্তরঙ্গ মুহূর্তের গল্প শুনেছিলেন। এছাড়াও-

      • দীক্ষাগুরুর সান্নিধ্যঃ বৃন্দাবন দাসের দীক্ষাগুরু ছিলেন স্বয়ং নিত্যানন্দ প্রভু-যিনি ছিলেন চৈতন্যদেবের ছায়াসঙ্গী। নিত্যানন্দ প্রভুর প্রত্যক্ষ সাহচর্যে থেকে বৃন্দাবন দাস চৈতন্যলীলার আদি ও মধ্য পর্বের সমস্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।

     অলৌকিকত্বের মাঝে লৌকিক ও মানবীয় রূপের প্রকাশআসলে মধ্যযুগের দেবতাকেন্দ্রিক সাহিত্যের যুগে বাস করেও বৃন্দাবন দাস চৈতন্যদেবকে কেবল দূর আকাশের দেবতা বানিয়ে রাখেননি। তিনি চৈতন্যদেবের লৌকিক ও রক্তমাংসের চরিত্রটিকে অসাধারণ দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর সেই দরদী মনোভাবের পরিচয় পাই-

      চপল বাল্যকালঃ নবদ্বীপের ধুলোবালিতে খেলে বেড়ানো দুরন্ত নিমাই, প্রতিবেশীদের ঘরে চুরি করে ক্ষীর-মাখন খাওয়া এবং গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি—এই সমস্ত বর্ণনায় চৈতন্যদেব যেন বাংলার প্রতিটি সাধারণ ঘরের অত্যন্ত আদরের সন্তান হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি তাঁকে আমরা অন্যভাবে দেখতে পাই-

     বিদ্যাবিলাসী যুবকঃ উদ্ধত পণ্ডিত নিমাই কীভাবে ব্যাকরণ ও ন্যায়ের কূটতর্ক দিয়ে নবদ্বীপের দিক্বিজয়ী পণ্ডিতদের পরাস্ত করতেন, তাঁর সেই দাম্ভিক অথচ আকর্ষণীয় রূপটি বৃন্দাবন দাস নিখুঁতভাবে এঁকেছেন।

     •বাংলা কাব্যে প্রথম নাটকীয় সংলাপ ও গীতিময়তার সৃষ্টিবৃন্দাবন দাসের কাব্যের অন্যতম বড় কৃতিত্ব হলো এর চমৎকার নাট্যগুণ। তিনি চরিত্রের মুখে মুখে এমন সব সংলাপ বসিয়েছেন যা মধ্যযুগের গতানুগতিক কাব্যরীতির চেয়ে অনেক উন্নত। বিশেষ করে শচীমাতার সঙ্গে বিশ্বম্ভরের কথোপকথন, বিষ্ণুপ্রিয়ার নীরব বেদনা এবং কাজীর সঙ্গে বাদানুবাদের দৃশ্যগুলি পড়লে মনে হয় যেন চোখের সামনে কোনো নাটক অভিনীত হচ্ছে। পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের সহজ প্রবাহ কাব্যের পঠনযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

     •উপেক্ষিত সমাজ ও সাধারণ মানুষকে মর্যাদাদান।বৃন্দাবন দাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক কৃতিত্ব হলো তিনি তৎকালীন হিন্দু সমাজের জাতপাত ও শ্রেণিভেদের কঠোর প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষকে তাঁর কাব্যে জায়গা দিয়েছেন। এরই পাশাপাশি তিনি দেখালেন যে,কীভাবে শ্রীচৈতন্যদেব সমাজের তথাকথিত নিচুজাত বা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

        শ্রীধরের মতো দরিদ্র থোড়-বিক্রেতা, কাঞ্চন কাঞ্চনী বা সমাজের অবহেলিত ও অত্যাচারিত মানুষ—প্রত্যেকেই তাঁর কাব্যে সমান মর্যাদা পেয়েছে। এই সামাজিক সাম্যের বাণী সাহিত্যে আনা তাঁর এক বিরাট ঐতিহাসিক ও মানবিক কৃতিত্ব।

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,পরবর্তীকালে কৃষ্ণদাস কবিরাজের 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থে দার্শনিক তত্ত্বের গভীরতা বেশি থাকলেও, সাহিত্যিক সরসতা এবং ঐতিহাসিক সমাজচিত্রের দিক থেকে বৃন্দাবন দাসের 'চৈতন্যভাগবত' অনন্য ও অতুলনীয়। চৈতন্যদেবের মানবীয় রূপকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার আদি কারিগর হিসেবে বৃন্দাবন দাস বাংলা সাহিত্যাকাশে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এজন্যই কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রদ্ধাভরে লিখেছেন-

        "চৈতন্যলীলার ব্যাস-বৃন্দাবন দাস।"

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...