চৈতন্য জীবনী সাহিত্য।লোচন্য দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যের গুরুত্ব ও তাঁর কবি-প্রতিভার পরিচয় দাও।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মেজর প্রথম সেমিস্টার। ইউনিট৪।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের ধারায় বৃন্দাবন দাস ও কৃষ্ণদাস কবিরাজের পাশাপাশি আর এক বিশিষ্ট প্রতিভার নাম লোচন দাস (আসল নাম লোচনানন্দ দাস)। ষোড়শ শতকে রাঢ় অঞ্চলের কাটোয়ার কোগ্রামের বৈদ্য পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর রচিত ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যটি চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় গ্রন্থ। কবি তাঁর দীক্ষাগুরু নরহরি সরকারের আদেশে এই কাব্যটি রচনা করেন। জীবনীগ্রন্থ হলেও এটি মূলত গান বা সংগীতের রূপ ধরে পরিবেশিত হয়েছিল।আর সেখানে আমারা দেখি-
•লোচন দাসের কবি-প্রতিভার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ।লোচন দাস কেবল একজন জীবনীকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন উচ্চমানের পদকর্তা ও সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর কবি-প্রতিভার মূল দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-
গীতিময়তা ও সঙ্গীতধর্মিতাঃলোচন দাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর গীতি-প্রতিভা। 'চৈতন্যমঙ্গল' কাব্যে বর্ণনার চেয়ে গানের প্রাধান্য অনেক বেশি। কাব্যটি পাঁচালির ঢঙে সুর করে গাওয়ার জন্য রচিত হয়েছিল। তিনি বহু রাগ-রাগিণীর ব্যবহারে পারদর্শী ছিলেন।
নরহরি সরকারের প্রভাব ও গৌরনাগরবাদঃ লোচন দাসের কবি-প্রতিভা তাঁর গুরু নরহরি সরকারের ভাবাদর্শে গড়ে উঠেছিল। নরহরি সরকার ছিলেন বৈষ্ণব সমাজে'গৌরনাগরবাদ'-এর (চৈতন্যদেবকে ব্রজের কৃষ্ণের মতো নাগর বা প্রেমিক রূপে কল্পনা করা) প্রধান প্রবক্তা। লোচন দাসের কাব্যেও এই গৌরনাগরবাদের সার্থক কাব্যিক প্রতিফলন ঘটেছে।
করুণ ও বাৎসল্য রসের সার্থক রূপায়নঃ শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণের দৃশ্য এবং বিষ্ণুপ্রিয়া ও শচীমাতার যে ব্যাকুলতা লোচন দাস ফুটিয়ে তুলেছেন, তা গভীর করুণ রসের সৃষ্টি করে। বিষাদ সিন্ধু মন্থন করে তিনি যে সুর সৃষ্টি করেছেন, তা বাঙালির হৃদয়কে স্পর্শ করে।
•চৈতন্য জীবনী সাহিত্যে ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যের গুরুত্ব ও অবদান।চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের ধারায় লোচন দাসের এই কাব্যের গুরুত্ব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উভয় দিক থেকেই অপরিসীম। আর সেখানে আমরা পাই-
ক) ‘গৌরনাগরবাদ’ বা লৌকিক প্রেমের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা।বৃন্দাবন দাস তাঁর কাব্যে গৌরনাগরবাদের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু লোচন দাস নির্ভয়ে তাঁর কাব্যে এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন। নবদ্বীপের নারীরা যেভাবে কৃষ্ণরূপে গৌরসুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হতেন, তার আকর্ষণীয় বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এটি চৈতন্যদেবের চরিত্রে এক অদ্ভুত লৌকিক ও রোমান্টিক মাত্রা যোগ করেছে।
খ) বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রের ট্র্যাজিক মহিমা।লোচন দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রের সার্থক চিত্রায়ণ। চৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণের রাতে শয্যাপাশে বিষ্ণুপ্রিয়ার নীরব কান্না, তাঁর হৃদয়ের হাহাকার এবং জাগতিক প্রেমের চরম আত্মত্যাগের যে করুণ ছবি লোচন দাস এঁকেছেন, তা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয়।
"হায় হায় কিবা হইল মস্তক ভাঙিয়া।/ নিশি পোহাইয়া গেল গৌর না দেখিয়া।।"
আসলে এই অংশে বিষ্ণুপ্রিয়ার বেদনার রূপটি চিরন্তন বাঙালি নারীর ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
গ) পাঁচালি ঢঙের লোকপ্রিয়তা। কাব্যটি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সহজে ছড়িয়ে পড়েছিল কারণ কবি একে জটিল শাস্ত্রীয় তত্ত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ করেননি। সরল ভাষা, সহজ উপমা এবং মধুর সুরের সংমিশ্রণে তিনি চৈতন্যদেবকে আপামর গ্রাম্য বাঙালির প্রাণের ঠাকুর করে তুলতে পেরেছিলেন।
পরিশেষে বলতে পারি যে,বৃন্দাবন দাসের কাব্যে যেখানে ছিল ঐতিহাসিক সমাজচিত্র এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের কাব্যে ছিল প্রগাঢ় দার্শনিক তত্ত্ব, সেখানে লোচন দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যে প্রাধান্য পেয়েছে হৃদয়ের আকুল আবেগ এবং সঙ্গীতময় লালিত্য। জীবনীগ্রন্থ হিসেবে কিছুটা শিথিল হলেও, খাঁটি বাঙালি হৃদয়ের রসের উপাদান হিসেবে লোচন দাসের কাব্য চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উজ্জ্বল মাইলফলক।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment