আখ্যান কাব্য কাকে বলে? আখ্যান কাব্যের বৈশিষ্ট্য লেখো। একটি সার্থক আখ্যান কাব্যের পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
•আখ্যান কাব্যঃ যে কাব্যে কোনো পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, কাল্পনিক বা সামাজিক গল্প বা কাহিনীকে পদ্যের (কবিতার) ছন্দে ও সুরে ব্যক্ত করা হয়, তাকে আখ্যান কাব্য বলা হয়। সরল কথায়, এটি হলো কবিতায় লেখা গল্প। এখানে গীতিকবিতার মতো কবির ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতির চেয়ে কাহিনীর গতিময়তা ও চরিত্রের কর্মকাণ্ডই প্রধান হয়ে ওঠে।
•আখ্যান কাব্যের বৈশিষ্ট্য
১) আখ্যান কাব্য হলো কাহিনী-প্রধান। আখ্যান কাব্যের মূল ভিত্তিই হলো একটি সুসংবদ্ধ গল্প বা কাহিনী। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট কাহিনীর ধারা বজায় থাকে।
২) চরিত্র সৃষ্টি।কাহিনীর প্রয়োজনে এতে বিভিন্ন চরিত্রের আগমন ঘটে। চরিত্রগুলোর সংলাপ, দ্বন্দ্ব ও আচরণের মধ্য দিয়ে গল্পটি এগিয়ে যায়।
৩) বস্তুনিষ্ঠতা।এখানে কবির নিজস্ব সুখ-দুঃখের চেয়ে চরিত্রের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ বেশি গুরুত্ব পায়। কবি নিজে আড়ালে থেকে গল্পটি বর্ণনা করেন।
৪) নাটকীয়তা।কাহিনীতে কৌতূহল ও উত্তেজনা বজায় রাখার জন্য অনেক সময় নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়।
৫) বর্ণনাত্মক শৈলী।আখ্যান কাব্যে পরিবেশ, যুদ্ধ, প্রেম বা কোনো বিশেষ ঘটনার দীর্ঘ ও মনোজ্ঞ বর্ণনা থাকে।
৬) ছন্দ ও সুরের ব্যবহার: পুরো গল্পটি পদ্যের আকারে বা কোনো নির্দিষ্ট ছন্দের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়, যা একে সাধারণ গদ্যের গল্প থেকে আলাদা করে।
•সার্থক আখ্যান কাব্য: 'মেঘনাদবধ কাব্য' (১৮৬১)•
মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত 'মেঘনাদবধ কাব্য' বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শুধু একটি সার্থক আখ্যান কাব্যই নয়, এটি একটি অনন্যসাধারণ 'মহাকাব্য' (Epic)। নয়টি সর্গে বিন্যস্ত এই কাব্যে রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের সামান্য অংশের কাহিনীকে কেন্দ্র করে এক বিশাল আখ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। আর সেখানে আমরা দেখি-
১)কাহিনীর সুসংবদ্ধ গঠন।একটি সার্থক আখ্যানের প্রধান শর্ত হলো তার গল্পের চমৎকার বাঁধন। মধুসূদন রামায়ণের সুদীর্ঘ কাহিনীর মধ্য থেকে মাত্র তিন দিন ও দুই রাতের ঘটনাকে বেছে নিয়েছেন। রাবণের পুত্র বীর মেঘনাদের বীরত্ব, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের হাতে অন্যায়ভাবে তার মৃত্যু এবং সবশেষে মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-এই সামান্য সময়ের ঘটনাকে কবি অত্যন্ত টানটান ও গতিময় আখ্যানে রূপ দিয়েছেন।
২)প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন ও নতুন চরিত্র সৃষ্টি।আখ্যান কাব্যের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে তার চরিত্রের গভীরতায়। মধুসূদন কৃত্তিবাসী রামায়ণের অন্ধ অনুকরণ করেননি। তিনি রাম-লক্ষ্মণকে প্রথাগত দেবতার আসন থেকে নামিয়ে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন, যারা লঙ্কা জয়ের জন্য ছলনার আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে, রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদকে দেখিয়েছেন দেশপ্রেমিক, বীর ও মহৎ হৃদয়ের অধিকারী হিসেবে। দেশের মাটিকে বিদেশি আক্রমণকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মেঘনাদের এই লড়াই আখ্যানটিকে এক আধুনিক মাত্রা দেয়।
৩) নাটকীয়তা ও দ্বন্দ্বঃমেঘনাদবধ কাব্যের আখ্যানটি অত্যন্ত নাটকীয়। বিশেষ করে ষষ্ঠ সর্গে যখন মেঘনাদ অস্ত্রহীন অবস্থায় নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে পুজো করছিলেন, তখন লক্ষ্মণ বিভীষণের সাহায্যে সেখানে প্রবেশ করে। এই অংশে চাচা বিভীষণ এবং ভাইপো মেঘনাদের মধ্যকার সংলাপ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আখ্যানের নাটকীয়তাকে চরম সীমায় নিয়ে যায়।
৪)বীর ও করুণ রসের অপূর্ব সমন্বয়।আখ্যানের মূল রস হলো বীরত্ব ও শোক। একদিকে মেঘনাদ ও রাবণের বীরদর্প যুদ্ধক্ষেত্রের এক রোমাঞ্চকর বিবরণ তৈরি করে, অন্যদিকে পুত্রহারা পিতা রাবণের হাহাকার এবং মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলার সহমরণ পাঠককে অশ্রুসিক্ত করে। আখ্যানের শেষে বীরত্বের চেয়ে 'করুণ রস' বা ট্র্যাজেডিই প্রধান হয়ে ওঠে, যা একে সার্থক করে তোলে।
৫) নতুন ছন্দ ও রচনারীতি-অমিত্রাক্ষর ছন্দ।বাংলায় এর আগে আখ্যান বা পয়ার মূলত হালকা ছন্দে লেখা হতো। মধুসূদনই প্রথম বাংলা আখ্যানে 'অমিত্রাক্ষর ছন্দ' (Blank Verse) ব্যবহার করেন। এই ছন্দের প্রভাবে কাহিনীর বর্ণনা গম্ভীর, রাজকীয় এবং গতিশীল হয়ে উঠেছে, যা যুদ্ধের বর্ণনা বা চরিত্রের আবেগ প্রকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'মেঘনাদবধ কাব্য' একটি সার্থক আখ্যান, কারণ এখানে কবি নিজের কথা বলেননি, বরং রাক্ষস বংশের বীরত্ব ও পতনের এক বিশাল গল্পকে কবিতার ছন্দে জীবন্ত করে তুলেছেন। এর সুশৃঙ্খল গল্পকাঠামো, মানবিক চরিত্রায়ণ এবং করুণ সমাপ্তিই একে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আখ্যান কাব্যের মর্যাদা দিয়েছে।
Comments
Post a Comment