Skip to main content

ছেলেবেলা।আমার জীবনে বাইরের খোলার ছাদ ছিল প্রধান ছুটির দেশ"- ছেলেবেলা অনুসরণে এই মুক্তির রাজ্যটিকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পরিচয় দাও।

ছেলেবেলা। আমার জীবনে বাইরের খোলার ছাদ ছিল প্রধান ছুটির দেশ"- ছেলেবেলা অনুসরণে এই মুক্তির রাজ্যটিকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ   রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'ছেলেবেলা'-তে তাঁর শৈশবের নানা স্মৃতির মধ্যে জোড়াসাঁকোর বাড়ির ছাদটি ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন রক্ষণশীল ও কড়া পাহারা ঘেরা গৃহবন্দি জীবনে এই ছাদই ছিল তাঁর প্রধান "ছুটির দেশ" ও অবাধ মুক্তির রাজ্য।আর এই ছাদকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আর সেই অভিজ্ঞতা নিম্ন সূত্রাকারে আমরা বলতে পারি-

       •মুক্তির রাজ্য ও বাইরের জগৎ।জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শিশুদের ওপর কাজের লোকদের (বিশেষ করে ভৃত্য শ্যামের) কড়া শাসন ছিল। ঘরের বাইরের জগতে সহজে যাওয়ার অনুমতি তাদের ছিল না। এই গৃহবন্দি জীবন থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল এই ছাদ। ছাদে পা দেওয়া মাত্রই বালক রবি এক পরম স্বাধীনতার স্বাদ পেতেন। ওপর থেকে দেখা খোলা আকাশ, আশপাশের বাড়ির চাল এবং দূরের জগৎ তাঁর কাছে অসীম মুক্ত আকাশের বার্তা নিয়ে আসত।

      •দুপুরের রোমাঞ্চ ও চিলেকোঠার রহস্য।দুপুরবেলা যখন বাড়ির বড়রা খেয়েদেয়ে ঘুমে মগ্ন থাকতেন, তখন বালক রবির আসল অ্যাডভেঞ্চার শুরু হতো। তিনি চুপিসারে কারোর চোখ এড়িয়ে ছাদে চলে যেতেন।যেখানে-

          ছাদের এক কোণে থাকা চিলেকোঠাটি ছিল তাঁর গোপন আস্তানা। এটি ছিল যেন রূপকথার কোনো অজানা দেশ।তবে-

         প্রখর রোদে গরম বাতাসে ছাদ যখন নির্জন হয়ে যেত, তখন তিনি সিঁড়ির কাছে বসে চারদিকের নীরবতা উপভোগ করতেন। সেই গরমের দুপুরের নির্জনতাকে তাঁর কাছে কোনো এক দূরদেশের রহস্যময় রূপকথা বলে মনে হতো।

       •স্নানের ঘরের কৃত্রিম জলপ্রপাত।ছাদের কাছেই ছিল একটি কলের স্নানের ঘর। পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে সেখানে ঢোকা ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ঘরের দরজা বন্ধ করে বালতি ভরে গায়ে জল ঢালাকে তিনি কোনো এক পাহাড়ি ঝরনা বা কৃত্রিম জলপ্রপাতের নিচে স্নান করার মতো উপভোগ করতেন।

      •'নতুন বউঠান' ও ছাদের বাগান।পরবর্তীকালে এই ছাদকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথের জীবনে যুক্ত হয় এক নতুন মাত্রা—তাঁর 'নতুন বউঠান' (কাদম্বরী দেবী)।কাদম্বরী দেবী ছাদে টবে সারি সারি গাছ লাগিয়ে ছোটখাটো একটি বাগান তৈরি করেছিলেন।যেখানে বিকেলের দিকে ছাদে মাদুর পেতে বসত আড্ডার আসর। সেখানে লেখালেখি, গান গাওয়া ও সাহিত্যচর্চা হতো। বালক রবির কল্পনার ডানায় হাওয়া দিত ছাদের এই নান্দনিক পরিবেশ।

       •ঋতু পরিবর্তনের রূপ।ছাদ থেকে কবি প্রকৃতির নানা রূপ প্রত্যক্ষ করতেন। আকাশে যখন কালো মেঘ জমত, ছাদে দাঁড়িয়ে তিনি বৃষ্টির জল ও মেঘের খেলা দেখতেন। শরতের কাঁচা রোদ আর নীল আকাশ ছাদে বসে কবিমনে এক অপার্থিব আনন্দের সৃষ্টি করত।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,জোড়াসাঁকোর অন্দরের কড়া শাসন ও একঘেয়েমি থেকে পালিয়ে বাঁচার নিরাপদ আশ্রয় ছিল এই ছাদ। এটি ছিল তাঁর কল্পনাশক্তি, প্রকৃতিপ্রেম এবং সাহিত্য চেতনার প্রথম উন্মেষক্ষেত্র। তাই কবি একে জীবনের "প্রধান ছুটির দেশ" বলে চিহ্নিত করেছেন।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...