Skip to main content

নেপোলিয়ন ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ধ্বংসকারী ও রক্ষাকর্তা উভয় উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

নেপোলিয়ন ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ধ্বংসকারী ও রক্ষাকর্তা উভয় উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ষষ্ঠ সেমিস্টার,ইতিহাস মাইনর।

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ফরাসি ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ফরাসি বিপ্লব। আর ঐতিহাসিক লুই মাদেলিন প্রথম এই মন্তব্যটি করেছিলেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৭৯৯ সালে ফ্রান্সে ক্ষমতা দখল করেন। একদিকে তিনি বিপ্লবের মূল আদর্শগুলোকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন, আবার অন্যদিকে নিজের স্বার্থে বিপ্লবের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করেন। এই কারণেই তাকে ফরাসি বিপ্লবের 'রক্ষাকর্তা'এবং 'ধ্বংসকারী' উভয়ই বলা হয়।

     • নেপোলিয়নকে বিপ্লবের 'রক্ষাকর্তা'।নেপোলিয়ন ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক আদর্শগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলোকে স্থায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর সেখানে-

      আইনের চোখে সমতা (কোড নেপোলিয়ন)।তিনি ফ্রান্সের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইনগ্রন্থ বা'কোড নেপোলিয়ন'প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে সমাজে জন্মগত বা বংশগত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হয় এবং আইনের চোখে সব নাগরিককে সমান অধিকার দেওয়া হয়, যা ছিল ফরাসি বিপ্লবের মূল দাবি (সাম্য)।শুধু তাই নয়-

      যোগ্যতার স্বীকৃতি। যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে তিনি বিপ্লবের 'সাম্য' নীতি প্রতিষ্ঠা করেন। বংশমর্যাদা নয়, মেধার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পদ ও পুরস্কার (যেমন: লিজিয়ন অব অনার) দেওয়া শুরু হয়।আবার -

       ধর্মীয় সহনশীলতা (কনকরডাট)। ১৮০১ সালে পোপের সঙ্গে চুক্তি (Concordat) করে তিনি ফ্রান্সে ক্যাথলিক ধর্মকে স্বীকৃতি দেন, কিন্তু চার্চকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসেন। এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকে, যা বিপ্লবী চেতনার অংশ ছিল।অতঃপর -

       সামন্ততন্ত্রের অবসান।ফরাসি বিপ্লব যেভাবে ফ্রান্সে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছিল, নেপোলিয়ন সেই পরিবর্তনকে আইনি স্বীকৃতি দেন। বিপ্লবের সময় বাজেয়াপ্ত করা চার্চ ও অভিজাতদের জমি যারা কিনেছিলেন, নেপোলিয়ন তাদের সেই মালিকানা অক্ষুণ্ণ রাখেন।

• নেপোলিয়নকে বিপ্লবের 'ধ্বংসকারী'

      বিপ্লবের সামাজিক সংস্কারগুলো রক্ষা করলেও, নেপোলিয়ন বিপ্লবের রাজনৈতিক আদর্শ বা 'স্বাধীনতা'কে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। যারফলে-

      গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার অবসান হয়।ফরাসি বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু নেপোলিয়ন ১৮০৪ সালে নিজেকে ফ্রান্সের 'সম্রাট' ঘোষণা করে ফ্রান্সে আবার বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন।এরই পাশাপাশি-

      ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ ও সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা করা হয়।তিনি মানুষের বাক-স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সরকারের সমালোচনা বন্ধ করতে বহু সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং গোয়েন্দা পুলিশ দিয়ে বিরোধীদের দমন করা হয়।শুধু তাই নয়-

      নারীদের অধিকার খর্ব করা হয়।কোড নেপোলিয়নে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ফরাসি বিপ্লবের সময় নারীরা যেটুকু আইনি অধিকার ও স্বাধীনতা পেয়েছিলেন, নেপোলিয়নের আইনে তা আবার কেড়ে নেওয়া হয় এবং নারীদের সম্পূর্ণভাবে বাবা বা স্বামীর অধীনস্থ করা হয়।যারফলে-

      উগ্র সাম্রাজ্যবাদ। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ছিল বিশ্বজনীন মানুষের মুক্তি। কিন্তু নেপোলিয়ন ইউরোপের অন্যান্য দেশ জয় করে সেখানে নিজের ভাই-বোন ও আত্মীয়দের শাসক হিসেবে বসিয়ে দেন, যা বিপ্লবী চেতনার পরিপন্থী ছিল।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, নেপোলিয়ন ফরাসি বিপ্লবের 'সাম্য' (Equality) ও 'মৈত্রী' (Fraternity) আদর্শকে রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার লোভে বিপ্লবের 'স্বাধীনতা' (Liberty) আদর্শকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছিলেন। তাই ঐতিহাসিক ফিশারের ভাষায় বলা যায়-

"তিনি বিপ্লবের সন্তান ছিলেন এবং সেই সন্তানই তার জননীকে হত্যা করেছিলেন।"



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...