বৈদিক যুগের সমাজ ব্যবস্থা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর (History Minor)।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ইতিহাসে বৈদিক যুগকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়-
১)ঋগ্বৈদিক বা আদি বৈদিক যুগঃ(আনুমানিক ১৫০০ - ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
২)পরবর্তী বৈদিক যুগঃ (আনুমানিক ১০০০ - ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
•পারিবারিক কাঠামোঃবৈদিক সমাজে পরিবারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদিক সমাজ ছিল মূলত পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্যকে ‘গৃহপতি’বা‘কুলপ’ বলা হতো। পরিবারের ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল।
একান্নবর্তী পরিবারঃপিতা, মাতা, সন্তান, ভাই-বোন সকলে মিলে একসাথে বসবাস করত। সমাজ ব্যবস্থার সর্বনিম্নে ছিল পরিবার (কুল) এবং একাধিক পরিবার নিয়ে গঠিত হতো গ্রাম।
•বর্ণপ্রথা ও শ্রেণীবিভাগঃবৈদিক সমাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বর্ণপ্রথার বিকাশ-
•আদি বৈদিক যুগঃঋগ্বৈদিক যুগে সমাজ ছিল অপেক্ষাকৃত মুক্ত ও উদার। গায়ের রঙ বা বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকলেও বর্ণপ্রথা জন্মভিত্তিক ছিল না, ছিল কর্মভিত্তিক। একই পরিবারের সদস্য ভিন্ন ভিন্ন পেশা গ্রহণ করতে পারতেন। ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ‘পুরুষসূক্তে’ প্রথম চার বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) উল্লেখ পাওয়া যায়।
•পরবর্তী বৈদিক যুগঃএই যুগে বর্ণপ্রথা অত্যন্ত কঠোর ও জন্মভিত্তিক হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সমাজিক ক্ষমতার শীর্ষে চলে আসে, বৈশ্যদের ওপর করভার চাপে এবং শূদ্ররা সমাজে চরম অবহেলিত ও শোষিত শ্রেণীতে পরিণত হয়।
• নারীদের অবস্থানঃসমাজের অর্ধেক অংশ অর্থাৎ নারীদের সামাজিক অবস্থান দুটি যুগে ভিন্ন রূপ নিয়েছিল:
•আদি বৈদিক যুগে উচ্চ মর্যাদাঃএই যুগে নারীরা যথেষ্ট মর্যাদা ভোগ করতেন। বাল্যবিবাহ, সতীদাহ বা পর্দা প্রথার প্রচলন ছিল না। নারীরা শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পেতেন; অপালা, ঘোষা, বিশ্বতারা, লোপামুদ্রার মতো বিদুষী নারী ঋগ্বেদের মন্ত্র রচনা করেছিলেন। তারা ‘সভা’ ও ‘সমিতি’র মতো রাজনৈতিক সমিতিতেও যোগ দিতেন।
•পরবর্তী বৈদিক যুগে অবনতিঃএই যুগে সমাজে নারীদের অবস্থান অবনমিত হয়। তাদের রাজনৈতিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়, শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং বাল্যবিবাহের সূচনা ঘটে। গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো ব্যতিক্রমী নারী থাকলেও সাধারণ নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।
খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-পরিচ্ছদঃখাদ্যশস্য হিসেবে ধান, বার্লি, গম, দুগ্ধজাত দ্রব্য (ঘি, মাখন, দই) ছিল প্রধান খাদ্য। যজ্ঞ উপলক্ষে সাময়িকভাবে পশুমাংস ভক্ষণের প্রচলন ছিল। এ ছাড়া ‘সোমরস’ ও ‘সুরা’ নামক পানীয়ের ব্যবহার ছিল।
•পোশাকঃসুতি ও পশমের তৈরি পোশাক পরা হতো। পোশাকের প্রধান তিনটি অংশ ছিল-নিম্নাংশের পোশাক ‘বাসস’, উপরিভাগের পোশাক ‘অধিবাসস’ এবং অন্তর্বাস ‘নীভি’। নারী ও পুরুষ উভয়ই অলংকার পছন্দ করতেন।
•শিক্ষা ও বিনোদনে দেখি গুরুকুল প্রথাঃ শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র ছিল গুরুর আশ্রম বা গুরুকুল। শিক্ষা ছিল মূলত মৌখিক এবং গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা।পাশাপাশি-রথ দৌড়, পাশা খেলা, নৃত্য, গীত এবং শিকার করা ছিল সমাজের মানুষের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,আদি বৈদিক যুগের সমাজ ব্যবস্থা ছিল সহজ-সরল, শ্রেণিভেদহীন ও কিছুটা সমতাবাদী। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে পরবর্তী বৈদিক যুগে জটিলতা বাড়ে, বর্ণপ্রথা প্রখর হয় এবং নারীদের অবস্থানের অবনতি ঘটে। এই সামাজিক পরিবর্তনই পরবর্তীতে ষষ্ঠ শতকের প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের (জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম) পটভূমি তৈরি করেছিল।
Comments
Post a Comment