দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটক রচনায় অবদান আলোচনা করো।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটক রচনায় অবদান আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।
আমরা জানি যে,বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে, বিশেষত ঐতিহাসিক নাটক রচনায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (ডি. এল. রায়) এক কালজয়ী ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র রূপ নিচ্ছে, ঠিক সেই পটভূমিতে দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেমের এক নতুন জোয়ার এনেছিলেন। আর এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর ঐতিহাসিক নাট্য রচনায় যে প্রতিভা সামনে উঠে আসে তা হলো-
•ঐতিহাসিক সত্য ও কল্পনার মেলবন্ধন।দ্বিজেন্দ্রলাল কেবল ইতিহাসের শুষ্ক তথ্যকে নাটকে তুলে ধরেননি, বরং ইতিহাসের কঙ্কালে কল্পনার রক্ত-মাংস জুগিয়ে তাকে জীবন্ত করে তুলেছেন। তবে তিনি ইতিহাসের মূল সত্যকে বিকৃত করেননি। ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর মানবিক দ্বন্দ্ব, পতন ও গৌরবকে তিনি নাট্যরূপ দিয়েছেন।
• স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ।দ্বিজেন্দ্রলালের ঐতিহাসিক নাটকগুলোর মূল সুর ছিল দেশাত্মবোধ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় ভারতীয়দের মনে সুপ্ত জাতীয়তাবোধ ও বীরত্বকে জাগিয়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
'রানা প্রতাপসিংহ' (১৯০৫)। মেবারের রানা প্রতাপের মুঘল-বিরোধী সংগ্রাম এবং দেশের জন্য চরম আত্মত্যাগের কাহিনী দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।'মেবার পতন' (১৯০৮)।এই নাটকে তিনি অন্ধ দেশপ্রেমের চেয়ে মহত্তর মানবপ্রেম ও বিশ্বভ্রাতৃত্বকে স্থান দিয়েছেন। সত্য ও ন্যায়ের জয়গান গেয়েছেন।'শাহজাহান' (১৯০৯)। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক নাটক। এখানে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসন দখলের লড়াইয়ের অন্তরালে এক বৃদ্ধ পিতার করুণ আর্তি এবং ঔরঙ্গজেবের তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
•চরিত্রায়নে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা।দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্রায়নে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের অবতারণা। তাঁর চরিত্রগুলো শুধু ভালো বা মন্দের সরল রৈখিক ছাঁচে ঢালা নয়। আর সেখানে -
ঔরঙ্গজেব ('শাহজাহান'),তিনি কেবল এক নিষ্ঠুর সম্রাট নন, তাঁর ভেতরের অনুশোচনা, সন্দেহ ও মানসিক যন্ত্রণা তাঁকে এক ট্রাজিক রূপ দিয়েছে।চন্দ্রগুপ্ত ('চন্দ্রগুপ্ত', ১৯১১),এখানে চাণক্যের কূটনীতি এবং চন্দ্রগুপ্তের বীরত্বের পাশাপাশি গ্রীক বিজেতা সেলিউকাস ও হেলেনের মানসিক টানাপোড়েন চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
• সংলাপে কাব্যময়তা ও নাট্যগীতের ব্যবহার।দ্বিজেন্দ্রলাল নাটকের সংলাপে এক ধরণের বাগ্মিতাপূর্ণ ও ওজস্বী ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা দর্শকদের আবেগ মথিত করত। এছাড়া তিনি নিজেই ছিলেন একাধারে উঁচুদরের সুরকার ও গীতিকার। তাঁর নাটকে ব্যবহৃত গানগুলো (যেমন: "ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা","একদা যাহার বিজয় সেনানী") নাটককে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে এবং তৎকালীন বাঙালি সমাজকে আলোড়িত করেছিল।
•পাশ্চাত্য নাট্যরীতির প্রভাব।দ্বিজেন্দ্রলাল বিলেত ফেরত থাকায় শেকসপিয়রীয় নাট্যরীতি (বিশেষ করে ট্র্যাজেডি ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত) এবং দ্বান্দ্বিক সংলাপ রচনার কৌশল খুব ভালো করে রপ্ত করেছিলেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এই মিলন তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলোকে আধুনিক ও গতিশীল করে তুলেছিল।আসলে-
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটকগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, তা ছিল পরাধীন ভারতের জাতীয় জাগরণের হাতিয়ার। গিরিশচন্দ্র ঘোষ বা অমৃতলাল বসুর পরবর্তী যুগে বাংলা নাটমঞ্চকে সচল রাখতে এবং দর্শককে এক মহান আদর্শের মুখোমুখি দাঁড় করাতে দ্বিজেন্দ্রলালের অবদান চিরস্মরণীয়।
Comments
Post a Comment