সাহিত্যের তাৎপর্য।। "সাহিত্যই মানব হৃদয়ে সেই ধ্রুব অসীমের বিকাশ" প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্তব্যটির যথার্থ বিচার করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সাহিত্য’ বিষয়ক ভাবনার ছায়াবলম্বনে উদ্ধৃত মন্তব্যটি"সাহিত্যই মানব হৃদয়ে সেই ধ্রুব অসীমের বিকাশ"-অনতিববিক্ষোভ্য এক চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে। সাহিত্য সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব ও দর্শনের দিক থেকে অত্যন্ত গভীর ও তাত্পর্যপূর্ণ। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
• অসীমের ব্যাকুলতা ও সাহিত্যের চিরন্তন রূপ।মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ-কাল, স্থান ও শরীরের সীমানায় বাঁধা। কিন্তু মানুষের হৃদয় বা আত্মাও কি সেই ক্ষুদ্র সীমানায় আবদ্ধ থাকতে চায়? তা নয়। মানুষের মনের মধ্যে একটি "ধ্রুব অসীম"-অর্থাৎ অনন্ত সৌন্দর্য, প্রেম, বেদনা ও পরম সত্যকে ছোঁয়ার আকুলতা রয়েছে।আসলে বৈষয়িক জীবন যেখানে মানুষকে সীমাবদ্ধ করে, সাহিত্য সেখানেই অসীমের জানলা খুলে দেয়।আর এখানে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন—
"মানুষ অপ্রয়োজনের টানেই সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠে। সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ তার সসীম সত্তাকে অতিক্রম করে অসীমের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়।"
•ব্যক্তি-হৃদয় থেকে সার্বজনীন মানবহৃদয়ে রূপান্তর।উক্তিটির বড় শক্তি হলো "মানব হৃদয়ে" শব্দবন্ধটি। সাহিত্য কোনো একক ব্যক্তির খণ্ডিত সুখ-দুঃখের গল্প নয়। যখন একজন লেখক তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সাহিত্যের রূপ দেন, তখন তা সর্বজনীন মানবহৃদয়ের ব্যাকুলতা হয়ে ওঠে।রামায়ণের শোক কীভাবে বিশ্বসাহিত্যে চিরন্তন শ্লোকে পরিণত হলো, তা এর বড় উদাহরণ।সেখানে দেখি-
"বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বা আধুনিক সাহিত্যের যে-কোনো ব্যাকুলতা আসলে মানুষের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা সেই "অসীম প্রেম ও বেদনার"ই প্রকাশ।
•রূপের মধ্যে অরূপের সন্ধান।সাহিত্য রূপের জগতে বাস করেও 'অরূপ'-কে স্পর্শ করে। শব্দের সীমা, ভাষার সীমা যেখানে শেষ হয়, সাহিত্যের ব্যঞ্জনা সেখানে অসীমের ইঙ্গিত তৈরি করে।সাহিত্যের রস বা ভাব রূপময় পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী বস্তু থেকে তৈরি হলেও, তা পাঠককে এক নিত্য ও অসীম অনুভূতির জগতে উত্তীর্ণ করে।যেমন-
কোনো একটি নির্দিষ্ট ভালোবাসার গল্প পড়তে পড়তে পাঠক বিশ্বমানবের চিরন্তন প্রেমের অসীম মহিমাকে অনুভব করেন।
• চিরন্তন বা 'ধ্রুব' সত্তার বিকাশ।জগতে বস্তু বা বিষয় পরিবর্তনশীল, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের মূল রস-প্রেম, আনন্দ, বিস্ময়, শোক বা বৈরাগ্য-চিরন্তন বা 'ধ্রুব'। সাহিত্য এই ধ্রুব রসকে যুগে যুগে অমরত্ব দান করে। গ্রিক ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের রূপক-সংকেত নাটক কিংবা আধুনিক বাংলা কবিতা-সবত্রই মানুষের অন্তরের এই ধ্রুব অসীম সত্তাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,সাহিত্য হলো সসীমের বাঁধন ভেঙে অসীমের দিকে মানবহৃদয়ের এক মহাসফর। মানবমন কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে তৃপ্ত হয় না; সে চায় অসীমের স্পর্শ। সাহিত্যই ভাষার নিখুঁত ও সৌন্দর্যময় রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষের ভিতরের সেই পরম, শাশ্বত ও "ধ্রুব অসীম"-কে বিকশিত করে তোলে।
সুতরাং, নন্দনতাত্ত্বিক ও সাহিত্য-দর্শনের দৃষ্টিতে আলোচিত মন্তব্যটি অত্যন্ত যথার্থ, গভীর ও কালজয়ী।
Comments
Post a Comment