Skip to main content

বাংলা ছন্দে মোহিতলাল মজুমদারের কৃতিত্ব আলোচনা করো।

বাংলা ছন্দে মোহিতলাল মজুমদারের কৃতিত্ব আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মেজর চতুর্থ সেমিস্টার।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কাব্যসাহিত্যে মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮–১৯৫২) এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।কারণ তিনি কেবল দেহতাত্বিক রূপতৃষ্ণা ও ক্লাসিকাল ভাবগাম্ভীর্যের জন্যই নয়, বাংলা ছন্দের গঠনকৌশলে এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য আনয়নের জন্যও তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়। রবীন্দ্রছন্দের প্রবহমানতা ও লালিত্যের বিপরীতে গিয়ে মোহিতলাল ছন্দে ফিরিয়ে এনেছিলেন ওজস্বিতা, গাম্ভীর্য এবং একটি নিখুঁত স্থাপত্যগুণ। বাংলা ছন্দশাস্ত্রে তাঁর এই অসামান্য অবদান তাকে এক স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-

     • মোহিতলাল এর ছন্দে আছে ছন্দবন্ধে ওজস্বিতা ও গম্ভীর ধ্বনিঝংকার।রবীন্দ্র-যুগীয় ছন্দের প্রধান লক্ষণ ছিল কোমলতা, গতিময়তা ও তরল মাধুর্য। মোহিতলাল এই ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে বাংলা ছন্দে নিয়ে এলেন গম্ভীর, ওজস্বী ও ধাতব শব্দঝংকার। সংস্কৃত কাব্যের ধ্রুপদী ভাব ও গুরুগম্ভীর রীতির সংমিশ্রণে তিনি এক নতুন ধ্বনিপ্রবাহ সৃষ্টি করেন। যে ধ্বনি প্রবাহে আমরা দেখি-

   "চিরকাল হিয়া মোর মরু-তৃষা-কাতর!/পাষাণিয়া পিয়াসার পানপাত্রে নিঙাড়ি’/কে মোরে পিয়ালে সুধা বিষে জড়ামড়!"

                                                    (‘পানপান্থ’)

       • যুক্তবর্ণ ও তৎসম শব্দের কৌশলী ব্যবহার।ছন্দে গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তা আনার জন্য মোহিতলাল প্রচুর পরিমাণে গুরুভার তৎসম শব্দ এবং জটিল যুক্তবর্ণ ব্যবহার করেছেন। যুক্তবর্ণের কৌশলী প্রযোগের ফলে তাঁর ছন্দে একপ্রকার বিলম্বিত ও ওজস্বী লয় তৈরি হয়, যা পয়ার বা অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে অনন্য মাত্রা দান করে।

       •অক্ষরবৃত্ত বা যৌগিক ছন্দের নতুন রূপায়ন।বাংলা অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে অমিত্রাক্ষর ও পর্বভিত্তিক সুসংহত রূপ দিতে মোহিতলালের কৃতিত্ব অতুলনীয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের পর অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে এতোটা শক্তিমান ও স্থাপত্যসুদৃঢ় করে তোলা অন্য কোনো কবির পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি পর্বের সীমানা ও শ্বাসাঘাতকে নিয়ন্ত্রণ করে অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে এক গম্ভীর ধ্রুপদী রূপ দিয়েছেন-

 "কভু ভাবি, বিশ্ব এ যে মায়াবীর যাদু!/স্বপন-অলীক মিথ্যা সত্য নাম ধরি’/মোরে ছলিতেছে অহরহ!"

        • মাত্রাবৃত্ত বা কলাবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্য।মোহিতলাল কেবল অক্ষরবৃত্তেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও তাঁর দক্ষতা ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে ৪, ৫ বা ৬ মাত্রার লয়ে তিনি যখন মাত্রাবৃত্ত ছন্দ প্রয়োগ করতেন, তখন তাতে এক অদ্ভুত ঝংকার সৃষ্টি হতো। তাঁর ‘নূরের জাঁক’ বা ‘পানপান্থ’ কবিতায় এর চমৎকার প্রয়োগ দেখা যায়।

    •আরবি-ফারসি শব্দ ও দেশজ শব্দের ছন্দোবদ্ধ মিশ্রণ।মোহিতলালের কাব্যরীতির অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো তৎসম/সংস্কৃত শব্দের পাশাপাশি আরবি, ফারসি ও খাটি বাংলা শব্দের নিখুঁত ছন্দোবদ্ধ প্রয়োগ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বৈপরীত্যধর্মী শব্দবন্ধকেও ছন্দের নিখুঁত বাঁধুনিতে এনে গম্ভীর ধ্বনি তৈরি করা যায়। সেখানে আমরা পাই -

 "হেরিয়া নূরের জাঁক/চমকি ছাড়ে সে হাঁক!"

     •  ছন্দের নিখুঁত স্থাপত্য।মোহিতলালের ছন্দরীতিতে কোনো শিথিলতা বা বিশৃঙ্খলা নেই। তিনি ছিলেন ছন্দ-স্থাপত্যের রূপকার। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের অনেক কবি যখন মুক্তক বা গদ্যছন্দের দিকে ঝুঁকছিলেন, মোহিতলাল তখন কঠোর ছন্দোবদ্ধ রূপকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। তাঁর ছন্দের প্রতিটি পর্ব এবং চরণ অতিমাত্রায় শৃঙ্খলিত ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা।

       পরিশেষে বিশেষভাবে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুকোমল ছন্দোময়তার যুগে মোহিতলাল মজুমদার বাংলা ছন্দে এক ‘পৌরুষেয়’ ও ধ্রুপদী তেজস্বিতা ফিরিয়ে এনেছিলেন। মধুসূদনের শক্তি ও রবীন্দ্রনাথের রূপকল্পের মাঝে নিজের স্বতন্ত্র ছন্দোরীতি তৈরি করা সহজ কাজ ছিল না-কিন্তু মোহিতলাল তা সফলভাবে করেছিলেন।আসলে ছন্দ গঠনে এই দৃঢ়তা, যুক্তবর্ণের সার্থক ঝংকার এবং ওজস্বী চালের জন্যই বাংলা ছন্দের ইতিহাসে মোহিতলাল মজুমদার চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলা ছন্দ সাহিত্যে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...