একজন মা কীভাবে একটি শনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠেছেন , উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করো।
একজন মা কীভাবে একটি শনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠেছেন , উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার,বাংলা মাইনর।
মহাশ্বেতা দেবীর কালজয়ী রাজনৈতিক উপন্যাস 'হাজার চুরাশির মা'-এর প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গভীর অর্থবহ। এখানে একজন সাধারণ মা কীভাবে তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক পরিচয় হারিয়ে একটি হিমশীতল 'শনাক্তকরণ নম্বর'(১০৮৪)-এর মাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠলেন এবং সেই যন্ত্রণাদায়ক রূপান্তর কীভাবে তাঁকে এক অনন্য প্রতিবাদী সত্তায় পরিণত করল-তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
সনাক্তকরণ নম্বর '১০৮৪' এবং ব্রতীর নির্মম পরিণতি।উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা চ্যাটার্জি। তিনি কলকাতার এক উচ্চবিত্ত, সুবিধাবাদী এবং আত্মকেন্দ্রিক পরিবারের গৃহবধূ। সুজাতার কনিষ্ঠ ও প্রিয় পুত্র ব্রতী সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে নকশাল আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল। ১৯৭১ সালের এক রাতে ব্রতী ও তার কমরেডদের অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে পুলিশ।
পুলিশের খাতায় ব্রতীর মরদেহটিকে কোনো নাম দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র তাকে কোনো মানুষ বা মায়ের সন্তান হিসেবে বিবেচনা করেনি; তার পরিচয় ছিল কেবল একটি সংখ্যা—১০৮৪ (হাজার চুরাশি)। মর্গে পড়ে থাকা লাশের গায়ে ঝুলিয়ে দেওয়া এই রুক্ষ 'সনাক্তকরণ নম্বর' দিয়েই শুরু হয় সুজাতার জীবনের এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক রূপান্তর।
মায়ের নিজের নাম ও পরিচয় হারিয়ে 'হাজার চুরাশির মা' হয়ে ওঠা।উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে সুজাতার এই সনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি স্তরে বিকশিত হয়েছে-
ক) বুর্জোয়া সমাজের মুখোশ উন্মোচন ও ছেলের অস্বীকার।ব্রতীর মৃত্যুর খবর যখন চ্যাটার্জি পরিবারে পৌঁছায়, তখন সুজাতার স্বামী দিব্যনাথ চ্যাটার্জি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শোকগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে নিজেদের সামাজিক সম্মান বাঁচাতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা ব্রতীর লাশটি পর্যন্ত সনাক্ত করতে বা বাড়িতে আনতে অস্বীকৃতি জানায়, যাতে সমাজে তাদের আভিজাত্যের গায়ে কোনো দাগ না লাগে। তারা ব্রতীর নাম নিজেদের পরিবার থেকে চিরতরে মুছে দিতে চায়। পরিবারের এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও স্বার্থপরতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সুজাতা একা মর্গে যান এবং বুক চিরে উপলব্ধি করেন—তার ব্রতী এখন আর ব্রতী নেই, সে এখন শুধু লাশ নম্বর '১০৮৪'।
খ)সনাক্তকরণ নম্বরকে আকড়ে ধরে সত্যের সন্ধান।পুত্রের মৃত্যুর ঠিক দুই বছর পর, ব্রতীর মৃত্যুর দিনটিতে (১৭ই জানুয়ারি) সুজাতা এক অন্তর্মুখী ভ্রমণের মুখোমুখি হন। তিনি ব্রতীর জীবনের গোপন দিকগুলো জানতে বাড়ি থেকে বের হন। তিনি খুঁজে বের করেন ব্রতীর রাজনৈতিক সতীর্থ সোমুর মা-কে এবং ব্রতীর প্রেমিকা নন্দিনীকে।
সোমুর মায়ের ভাঙা ঘর আর চোখের জল সুজাতাকে বোঝায় যে, মাতৃত্বের কোনো শ্রেণীভেদ হয় না।নন্দিনীর( ব্রতীর প্রেমিকা এবং আন্দোলনের সহযোদ্ধা)চোখে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়াবহতার বিবরণ শুনে সুজাতা বুঝতে পারেন তাঁর ছেলে কোনো সাধারণ অপরাধী বা সন্ত্রাসী ছিল না; সে এক বিশাল বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্নে আত্মবলিদান দিয়েছিল।
এই সত্য অনুসন্ধানের যাত্রায় সুজাতার কপালে সমাজ আর পরিবার অলিখিতভাবে লেপে দেয় এক নতুন তকমা। তিনি আর কর্পোরেট কর্তা দিব্যনাথের স্ত্রী নন, কিংবা সম্ভ্রান্ত ঘরের কর্ত্রী নন-তিনি সমাজের চোখে কেবলই "হাজার চুরাশির মা"এক রাষ্ট্রদ্রোহী নকশালের মা।
গ)ব্যক্তিসত্তা থেকে বিশ্বজনীন মাতৃত্বে উত্তরণ।পুলিশ যখন ব্রতীর লাশের গায়ে '১০৮৪' নম্বরটি ঝুলিয়ে দিয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্রতীর আদর্শ ও তার স্মৃতিকে একটি নামহীন সংখ্যার খাঁচায় বন্দি করে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। কিন্তু সুজাতা চ্যাটার্জি সেই শুষ্ক, রাষ্ট্র-প্রদত্ত সনাক্তকরণ নম্বরটিকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করেন।
নম্বরটি তাঁর জন্য আর কোনো ঘৃণার চিহ্ন থাকে না; তা হয়ে ওঠে তাঁর গর্ভজাত সন্তানের একমাত্র জীবিত স্মারক। সুজাতা যখন নিজেকে 'হাজার চুরাশির মা' হিসেবে মেনে নেন, তখন তিনি আর শুধু ব্রতীর মা থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন সেই সমস্ত নামহীন, পরিচয়হীন তরুণ বিপ্লবীদের মা, যাদের রাষ্ট্র ক্ষমতার জোরে বুলেটের আঘাতে সংখ্যায় পরিণত করেছিল।
উপন্যাসের শেষ পর্বে আমরা দেখি, সুজাতা তাঁর পরিবারের তথাকথিত উৎসব ও মেকি আভিজাত্যের আসরে দাঁড়িয়ে তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করছেন। তিনি অনুধাবন করেন যে আসল মৃত তো তাঁর ছেলে ব্রতী বা সোমু নয়; আসল মৃত ও পচনশীল হলো এই সমাজব্যবস্থা এবং তাঁর নিজের পরিবার।আসলে-
মায়ের এই '১০৮৪' নম্বরের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া আসলে শোষক রাষ্ট্রযন্ত্রের গালে এক সজোরে চপেটাঘাত। রাষ্ট্র চেয়েছিল ব্রতীকে স্রেফ একটি তুচ্ছ সংখ্যা বানিয়ে মুছে দিতে, কিন্তু মা সুজাতা সেই সংখ্যাকে উপন্যাসের শিরোনাম ও চিরকালীন প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়ে তুলেছেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,মহাশ্বেতা দেবী অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি যান্ত্রিক 'সনাক্তকরণ নম্বর' একজন মায়ের নীরব বুকফাটা কান্নাকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর করে। "হাজার চুরাশির মা" হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই সুজাতা তাঁর ঘরের পুতুল-জীবন থেকে মুক্ত হয়ে রাজপথের জ্বলন্ত বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠেন এবং একজন মা সনাক্তকরণ নম্বরের নির্মম পরিচিতির আড়ালে প্রকৃত অর্থেই এক কালজয়ী প্রতিবাদী সত্তায় উন্নীত হন।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment