Skip to main content

‘চৈতন্যভাগবত’ ও ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ কাব্যের তুলনামূলক আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর, ইউনিট৪।

       বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনী নিয়ে একাধিক কাব্য রচিত হলেও বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ অনন্যসাধারণ খ্যাতির অধিকারী। এই দুটি গ্রন্থ কেবল দুটি ভিন্ন কবির রচনা নয়, বরং চৈতন্যজীবনী রচনার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও যুগের প্রতিনিধি। কৃষ্ণদাস কবিরাজ স্বয়ং বৃন্দাবন দাসের কাব্যকে ভিত্তি করে নিজের লেখনী ধারণ করলেও, দুটি কাব্যের রচনাশৈলী, বিষয়বস্তু এবং লক্ষ্যের মধ্যে গভীর পার্থক্য ও নিজস্বতা রয়েছে। আর সেখানে আমরা দেখি-

 ১) যুগের পার্থক্য এবং রচনার প্রেক্ষাপট।চৈতন্যভাগবত (১৬শ শতাব্দী)শ্রীচৈতন্যদেবের তিরোধানের মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে রচিত হয়েছিল। তখনো চৈতন্য-পরিকরদের অনেকেই জীবিত ছিলেন। ফলে এই কাব্যে চৈতন্যদেবের সমসাময়িক জীবনের আবেগ, উত্তেজনা এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছোঁয়া অনেক বেশি সতেজ।কিন্তু-

       শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত (১৭শ শতাব্দীর সূচনালগ্ন)।

এটি চৈতন্যদেবের তিরোধানের বহু পরে, বৃন্দাবন দাসের কাব্যের প্রায় ৬০-৭০ বছর পর রচিত হয়। তখন চৈতন্যের প্রত্যক্ষ পরিকরেরা কেউ জীবিত ছিলেন না। তাই এই গ্রন্থ আবেগতাড়িত নয়, বরং অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও গবেষণাধর্মী তথ্যে সমৃদ্ধ।

২)ঘটনার বিন্যাস ও খণ্ডের গুরুত্ব।উভয় গ্রন্থই আদি, মধ্য ও অন্ত্য-এই তিনটি খণ্ডে বিভক্ত। কিন্তু দুই কবি জীবনের ভিন্ন ভিন্ন খণ্ডের ওপর জোর দিয়েছেন। যেখানে-

       চৈতন্যভাগবত গ্রন্থ রচনায় বৃন্দাবন দাসের ঝোঁক ছিল মূলত চৈতন্যদেবের প্রথম জীবনের লীলা অর্থাৎ আদি ও মধ্য খণ্ডের ওপর। নবদ্বীপের দিনগুলি, নিমাইয়ের বাল্যলীলা, পণ্ডিত জীবন ও সংকীর্তন আন্দোলনের বিবরণ এখানে যতটা বিস্তৃত, নীলাচল বা বৃন্দাবনের শেষ জীবন (অন্ত্য খণ্ড) সেখানে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত।কিন্তু -

       শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের রচনাকালে কৃষ্ণদাস কবিরাজ জানতেন যে বৃন্দাবন দাস পূর্ব জীবন সুন্দরভাবে বর্ণনা করে গেছেন (যাকে তিনি 'উচ্ছিষ্ট' বা সম্পূর্ণ বলে সম্মান জানিয়েছেন)। তাই তিনি তাঁর গ্রন্থে চৈতন্যের জীবনের শেষভাগের দিব্যোন্মাদ দশা এবং নীলাচলের জীবন অর্থাৎ অন্ত্য খণ্ডের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

৩) লীলা বনাম তত্ত্ব (রস ও দর্শন)।চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে বৃন্দাবন দাসের কাব্যে তত্ত্বকথার জটিলতা নেই বললেই চলে। তিনি চৈতন্যদেবকে মূলত অবতার হিসেবে দেখলেও, তাঁর নরলীলা বা মানুষের রূপটিকে চমৎকার কাব্যিক রসে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে প্রাধান্য পেয়েছে বাৎসল্য, সখ্য ও হাস্যরস।কিন্তু-

         কৃষ্ণদাস কবিরাজ কেবল জীবনীকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য পণ্ডিত ও দার্শনিক। তাই তাঁর কাব্যে চৈতন্যের জীবনীর আড়ালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের জটিল তত্ত্ব (যেমন-রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু শ্রীচৈতন্য, সাধ্য-সাধন তত্ত্ব) অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি মূলত তত্ত্ব ও তথ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

৪)সমাজচিত্র বনাম আধ্যাত্মিকতা।চৈতন্যভাগবত কাব্যের ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। ষোড়শ শতকের বাংলার কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থা, চাঁদ কাজীর সঙ্গে চৈতন্যের বিরোধ ও প্রথম সফল গণআন্দোলন এবং নিম্নবর্ণের মানুষের সমাজ-অধিকারের বাস্তব চিত্র এই কাব্যে জীবন্ত।কিন্তু -

       শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সামাজিক বা ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়ে চৈতন্যদেবের অন্তরের আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা, রাধাভাবের প্রকাশ এবং তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদদের (যেমন-রূপ-সনাতন গোস্বামী, রামানন্দ রায়) সঙ্গে দার্শনিক তত্ত্বালোচনার জগৎটি প্রাধান্য পেয়েছে।

৫)ভাষা ও প্রকাশশৈলী।চৈতন্যভাগবতের ভাষা অত্যন্ত সহজ, সরল ও লৌকিক বাংলার কাছাকাছি। পাঁচালি বা মঙ্গলকাব্যের ঢঙে রচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত সহজে আবেদন তৈরি করতে পেরেছিল।কিন্তু-

 * **শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত:** এর ভাষা অত্যন্ত মার্জিত, গম্ভীর এবং সংস্কৃত শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতিতে ভরপুর। দার্শনিক আলোচনার খাতিরে কবিকে বহু সংস্কৃত শ্লোক ব্যবহার করতে হয়েছে। তবে কবির পাণ্ডিত্যপূর্ণ পয়ার রচনার ক্ষমতা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিস্ময়।

## সারসংক্ষেপ তুলনা সারণী


| তুলনার বিষয় | ‘চৈতন্যভাগবত’ (বৃন্দাবন দাস) | ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ (कृष्णদাস কবিরাজ) |

| :--- | :--- | :--- |

| **মূল সুর** | আবেগ ও লীলাপ্রধান (রসাত্মক) | জ্ঞান, দর্শন ও তত্ত্বপ্রধান (পাণ্ডিত্যপূর্ণ) |

| **কেন্দ্রীয় খণ্ড** | আদি ও মধ্য খণ্ড (নবদ্বীপ লীলা) | অন্ত্য খণ্ড (নীলাচল ও বৃন্দাবন লীলা) |

| **চৈতন্যরূপ** | লৌকিক মানব ও অবতারের সমন্বয় | রাধা-কৃষ্ণের মিলিত তনু (তাত্ত্বিক রূপ) |

| **ভাষা** | সহজ, সরল, প্রবহমান বাঙালি ভাষা | গম্ভীর, মার্জিত ও সংস্কৃত শ্লোকসমৃদ্ধ |

| **প্রধান গুরুত্ব** | তৎকালীন সমাজচিত্র ও ঐতিহাসিক বিবরণ | বৈষ্ণব দর্শনের চূড়ান্ত প্রামাণ্য দলিল |


## উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, এই দুটি গ্রন্থের মধ্যে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চলে না, বরং এরা একে অপরের পরিপূরক। বৃন্দাবন দাস যদি শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনের বাহ্যিক রূপ ও লৌকিক মহিমাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে থাকেন, তবে কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীচৈতন্যদেবের অন্তরের গভীরতম আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক রূপটিকে পণ্ডিত সমাজের দরবারে চিরপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই কারণেই বাংলা জীবনী সাহিত্যের ইতিহাসে দুটি গ্রন্থই সমান মর্যাদায় ভাস্বর।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...