যেতে পারি কিন্তু কেন যাব? কবিতাটির মূলভাব বিশ্লেষণ করে কবিতাটিতে বিষন্ন আবহের ঊর্ধ্বে যে আশাবাদ ধ্বনিত হয়েছে তার পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় কবিতা হলো **'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব?'**। আপাতদৃষ্টিতে এই কবিতায় এক গভীর একাকীত্ব, ক্লান্তি এবং বিষণ্ণতার সুর ধরা পড়ে। কিন্তু কবিতাটির অন্তস্তলে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এটি আসলে জীবনবিমুখতার কবিতা নয়; বরং সমস্ত অবসাদ ও বিষণ্ণতাকে জয় করে জীবনের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা এবং আশাবাদের অমোঘ ইশতেহার।
নিচে কবিতাটির মূলভাব এবং বিষণ্ণতার ঊর্ধ্বে তার আশাবাদী চেতনার পরিচয় দেওয়া হলো:
## ১. কবিতার মূলভাব: টানাপোড়েন ও জীবনের অধিকার
কবিতাটির মূল ভাববস্তু আবর্তিত হয়েছে মানুষের চিরন্তন দুটি সত্তার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। একটি সত্তা জাগতিক নিয়ম, ক্লান্তি ও সাময়িক অভিমানে সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে চায় (মৃত্যু বা বৈরাগ্যের দিকে)। অন্য সত্তাটি জীবনের রূপ-রস-গন্ধ এবং মানবিক সম্পর্কের টানে এই পৃথিবীতেই থেকে যেতে চায়।
কবি অনুভব করেছেন যে, চলে যাওয়াটা খুব সহজ— সমাজ, সংসার বা জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মোটেও কঠিন নয়। কিন্তু কবি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন— **"কেন যাব?"** এই পৃথিবী, এই চেনা মানুষ, প্রকৃতির এই আলো-অন্ধকারকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো সার্থকতা নেই। জীবনকে তার সমস্ত ক্ষত ও যন্ত্রণা সমেত ভালোবাসার নামই যে প্রকৃত বেঁচে থাকা, এটাই কবিতার মূল ভাবনা।
## ২. বিষণ্ণ আবহ: একাকীত্ব ও অবসাদের মেঘ
কবিতার প্রথমাংশে এক নিবিড় বিষণ্ণতার আবহ তৈরি হয়েছে। কবি যখন বলেন—
> "ভাবনাগুলি খ্যাপা ষাঁড়ের মতো কেবলই গোঁত্তা মারে
> এবার আমি দেওয়াল তুলে নিজের চারিধারে
> সম্পূর্ণ একা হতে পারি।"
>
তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক আধুনিক মানুষের চরম মানসিক একাকীত্ব ও অবসাদের ছবি। চারপাশের কোলাহল, অবক্ষয় এবং নিজের বিক্ষিপ্ত ভাবনা থেকে বাঁচতে কবি চারদিকে দেওয়াল তুলে সম্পূর্ণ একাকীত্বের অন্ধকারে আশ্রয় নিতে চান। এই 'দেওয়াল তোলা' বা 'একা হওয়া' আসলে এক ধরণের মানসিক ক্লান্তি এবং পলায়নবৃত্তিরই প্রকাশ, যা কবিতায় একটি ধূসর ও বিষণ্ণ পরিবেশ তৈরি করে।
## ৩. বিষণ্ণতার ঊর্ধ্বে আশাবাদের জয়গান
কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায় ক্ষয় বা মৃত্যুর কবি নন, তিনি মূলত প্রাণের কবি। তাই কবিতার এই বিষণ্ণ আবহকে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দেয় কবির প্রবল জীবনতৃষ্ণা ও আশাবাদ। কবিতাটির নামকরণের মধ্যেই সেই নেতিবাচকতাকে অস্বীকার করার জেদ লুকিয়ে আছে।
* **অভিমান পেরিয়ে জীবনের টান:** কবি স্বীকার করেছেন যে তিনি চলে যেতে পারেন ("যেতে পারি"), কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর ভেতরের শুভবোধ ও জীবনের প্রতি ভালোবাসা জেগে ওঠে। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন তিনি এই সুন্দর পৃথিবীকে অসময়ে বিদায় জানাবেন?
* **মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন:** কবির এই আশাবাদ ধ্বনিত হয় যখন তিনি মানুষের মুখের দিকে তাকান, যখন তিনি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে নদী বা সমুদ্রের ডাক শোনেন। মানুষের ভালোবাসার টান এবং পৃথিবীর সৌন্দর্য কবিকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
* **সন্তানের মুখ ও ভবিষ্যৎ চেতনা:** কবিতার শেষ অংশে কবি এক পরম আশাবাদী ও বাৎসল্য রসে সিক্ত সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ান:
> "এখানে ঘুমে মগ্ন শিশুর মুখের ওপর জ্যোৎস্না পড়েছিল
> ভালোবেসে, ভালোবেসে..."
>
এই 'ঘুমন্ত শিশু' হলো আগামী দিনের প্রতীক, এক নিষ্পাপ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। আর তার ওপর প্রকৃতির 'জ্যেৎস্না' পড়া হলো জীবনের চিরন্তন আশীর্বাদ। এই দৃশ্য দেখার পর কোনো মানুষ জীবনবিমুখ হতে পারে না। শিশুর মুখের সরলতা এবং প্রকৃতির অফুরন্ত ভালোবাসা কবিকে মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে এখনও অনেক সুন্দর জিনিস দেখার বাকি আছে, অনেক ভালোবাসার ঋণ শোধ করার বাকি আছে।
## উপসংহার
সুতরাং বলা যায়, 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাব?' কবিতাটি আসলে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার এক আশ্চর্য উত্তরণ। কবি প্রথমে বিষণ্ণতা ও ক্লান্তির দেওয়ালে নিজেকে বন্দি করতে চাইলেও, শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা, প্রকৃতির মায়া এবং ভবিষ্যতের প্রতীক শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে সেই দেওয়াল ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসেন। চলে যাওয়ার সমস্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, এই পৃথিবীতেই থেকে যাওয়ার, লড়াই করার এবং ভালোবেসে বেঁচে থাকার যে অদম্য ইচ্ছা— তা-ই এই কবিতাকে বিষণ্ণতার ঊর্ধ্বে এক শাশ্বত আশাবাদের সার্থক রূপক করে তুলেছে।
Comments
Post a Comment