Skip to main content

চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের আদি কবি হিসেবে বৃন্দাবন দাসের কৃতিত্ব এবং ‘চৈতন্যভাগবত’ কাব্যের সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক মূল্য।

চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের আদি কবি হিসেবে বৃন্দাবন দাসের কৃতিত্ব এবং ‘চৈতন্যভাগবত’ কাব্যের সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক মূল্য। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর ইউনিট ৪।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ষোড়শ শতাব্দীতে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব এক যুগান্তকারী ঘটনা। চৈতন্যদেবের মহিমান্বিত জীবন ও আদর্শকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে যে নতুন ধারার সূচনা হয়, তা-ই 'চৈতন্য জীবনী সাহিত্য' নামে পরিচিত। এই ধারায় প্রথম ও শ্রেষ্ঠ আদি কবি হলেন বৃন্দাবন দাস। তাঁর রচিত 'চৈতন্যভাগবত' (পূর্বনাম: 'চৈতন্যমঙ্গল') বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সম্পূর্ণ চৈতন্য জীবনীকাব্য। কবি নিজে শ্রীচৈতন্যদেবকে সরাসরি না দেখলেও, চৈতন্য-পরিকরদের সাহচর্যে এসে তিনি এই অনন্য গ্রন্থটি রচনা করেন।

১. চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের আদি কবি হিসেবে বৃন্দাবন দাসের কৃতিত্ব।

        বৃন্দাবন দাসকে চৈতন্য জীবনী সাহিত্যের 'আদি কবি' বা 'ব্যাসদেব' বলা হয়। কবি হিসেবে তাঁর প্রধান কৃতিত্বগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-

       পথপ্রদর্শকের ভূমিকা।বৃন্দাবন দাসের পূর্বে চৈতন্যদেবকে নিয়ে সংস্কৃতে কড়চা (যেমন মুরারি গুপ্তের কড়চা) লেখা হলেও, বাংলা ভাষায় সহজ-সরল পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে চৈতন্যচরিত লেখার প্রথম কৃতিত্ব তাঁরই। পরবর্তীকালের কৃষ্ণদাস কবিরাজ বা লোচন দাস—সকলেই বৃন্দাবন দাসকে পথপ্রদর্শক মেনেছেন।

       •প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিশ্বস্ত রূপায়ন।বৃন্দাবন দাসের মাতা নারায়ণী দেবী ছিলেন শ্রীবাস পণ্ডিতের ভ্রাতুষ্পুত্রী। ফলে চৈতন্য-পরিকরদের ঘরের পরিবেশেই বৃন্দাবন দাসের বড় হয়ে ওঠা। নিত্যানন্দ প্রভুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করায় তিনি চৈতন্যের লীলা ও পার্ষদদের জীবন সম্পর্কে অত্যন্ত বিশ্বস্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন।

      •ভক্তির সঙ্গে বাস্তবতার মেলবন্ধন। বৃন্দাবন দাস চৈতন্যদেবকে পরমেশ্বর বা বিষ্ণুর অবতার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই অলৌকিকত্বের আড়ালে তিনি চৈতন্যের রক্তমাংসের মানব রূপটি অর্থাৎ তাঁর শৈশবের চপলতা, যৌবনের বিদ্যাবিলাস এবং নদিয়ার আপামর মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্যতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

২)‘চৈতন্যভাগবত’ কাব্যের সাহিত্যিক মূল্য।

সাহিত্যিক শিল্প সুষমায় ‘চৈতন্যভাগবত’ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল রত্ন। এর সাহিত্যিক মূল্য বিচার করতে গেলে কয়েকটি দিক নজরে পড়ে। আর সেই দিনগুলি হলো-

       •কাব্যরস ও সাবলীল ভাষা।কাব্যটিতে জটিল তত্ত্বকথার চেয়ে আখ্যান ও কাহিনীর সহজ সরল রস পরিবেশন করা হয়েছে। এর ভাষা অত্যন্ত গতিশীল এবং উপমা-রূপকের ব্যবহার চমৎকার।

     চরিত্রচিত্রণ। শুধু চৈতন্যদেবই নন, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত আচার্য, শ্রীবাস পণ্ডিত এবং পরম ভক্ত হরিদাস ঠাকুরের চরিত্র অত্যন্ত জীবন্ত ও নাটকীয়ভাবে চিত্রিত হয়েছে। বিশেষ করে চৈতন্যের মাতৃভক্তি ও শচীমাতার বাৎসল্য রস অত্যন্ত মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে।

       •নাটকীয়তা ও রসসৃষ্টি।কাব্যের আদিখণ্ডের নবদ্বীপ-লীলায় চৈতন্যদেবের জীবনের যে রূপ বর্ণিত হয়েছে, তা যেন এক চিরন্তন বাঙালি ঘরের চঞ্চল ও আদুরে ছেলের চিত্র। এর হাস্যরস, করুণ রস এবং শান্ত রসের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

৩)‘চৈতন্যভাগবত’ কাব্যের ঐতিহাসিক মূল্য।

       আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাছে ‘চৈতন্যভাগবত’ কেবল একটি ধর্মীয় জীবনীগ্রন্থ নয়, এটি ষোড়শ শতকের বাংলার ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। আর সেই গুরুত্বে আমরা দেখতে পাই-

      •তৎকালীন সমাজচিত্র।চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে বাংলার সমাজ কতটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, জরাজীর্ণ এবং নৈতিক অবক্ষয়ে ডুবে ছিল, তার নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন কবি-

   "ধর্ম কর্ম লোক কেবল মঙ্গল চণ্ডী গায়। মনসা পূজে লোক ঘৃত দিয়া ঘট গায়।।"

       •প্রথম গণআন্দোলন ও কাজীর দর্পচূর্ণ।চাঁদ কাজীর নির্দেশে সংকীর্তন বন্ধ করার বিরুদ্ধে শ্রীচৈতন্যদেব যে বিশাল নগরসংকীর্তন ও অহিংস গণবিক্ষোভ গড়ে তুলেছিলেন, তার চুলচেরা ঐতিহাসিক বিবরণ এই কাব্যে আছে। এটিই বাংলার ইতিহাসের প্রথম সফল নাগরিক আইন অমান্য আন্দোলন।

        •উদার সমাজচেতনা। জাতপাত ও শ্রেণিভেদহীন এক উদার সমাজের কথা এই কাব্যে ধ্বনিত হয়েছে। তৎকালীন ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিপরীতে নিম্নবর্গের মানুষের (যেমন হরিদাস ঠাকুর) প্রতি চৈতন্যের অকৃত্রিম ভালোবাসার ছবি সমাজ সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক দলিল।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,পরবর্তীকালে কৃষ্ণদাস কবিরাজের 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত'গ্রন্থে দার্শনিক তত্ত্বের গভীরতা বেশি থাকলেও, সাহিত্যিক সরসতা এবং ঐতিহাসিক সমাজচিত্রের দিক থেকে বৃন্দাবন দাসের 'চৈতন্যভাগবত' অনন্য ও অতুলনীয়। চৈতন্যদেবের মানবীয় রূপকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার আদি কারিগর হিসেবে বৃন্দাবন দাস বাংলা সাহিত্যাকাশে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এজন্যই কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রদ্ধাভরে লিখেছেন-

      "চৈতন্যলীলার ব্যাস—বৃন্দাবন দাস।"

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •







Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...