স্বপ্নময় চক্রবর্তীর 'গণেশ' গল্পে বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ এবং মানবিকতার চরম বিপর্যয় দেখা যায় আলোচনা কর।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর 'গণেশ' গল্পে বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ এবং মানবিকতার চরম বিপর্যয় দেখা যায় আলোচনা কর। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম মননশীল ও সমাজমনস্ক কথাসশিল্পী স্বপ্নময় চক্রবর্তী। তাঁর ‘গণেশ’ গল্পটি একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম অগ্রগতির যুগে দাঁড়িয়েও সমাজমানসে জেঁকে বসা অন্ধ কুসংস্কার, অলৌকিকতার মোহ এবং অর্থলিপ্সার এক নির্মম দলিল। এই গল্পে বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ কোনো গবেষণাগারের বিধ্বংসী মারণাস্ত্র হিসেবে আসেনি; বরং এসেছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আড়াল করে মানুষের অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করার মধ্য দিয়ে। লোভের তাড়নায় বিজ্ঞানকে স্তব্ধ করে দিয়ে একটি অসহায় প্রতিবন্ধী শিশুর জীবনে যে মর্মান্তিক পরিণতি নেমে এসেছিল, গল্পটিতে লেখক তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রতিবন্ধকতা বনাম অলৌকিকতার মুখোশ।গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘গণেশ’ কোনো দৈব ক্ষমতার অধিকারী অলৌকিক সত্তা নয়; সে আসলে জন্মগতভাবে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী এক অসহায় কিশোর। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সে ছিল 'ডাউন সিনড্রোম' এবং থাইরয়েডের হরমোনজনিত জটিলতার শিকার। তার মুখের অবয়ব ছিল বিকৃত, এবং একদিকের মাংসপেশি ও নাক এমনভাবে ঝুলে ছিল যা দেখতে অবিকল হাতির শুঁড়ের মতো লাগত। বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসার যুগে যা ছিল একটি করুণ ব্যাধি, সমাজ ও পরিবারের অর্থলোভী মানুষ তাদের অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের কারণে তাকে ‘গণেশ দেবতা’র অবতার বলে প্রচার করতে শুরু করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যমূলক অবহেলা ও আড়াল।গল্পে বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগের দিকটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সাহায্যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্লাস্টিক সার্জারি বা চিকিৎসার মাধ্যমে ছেলেটিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু অর্থলিপ্সার কাছে এখানে বিজ্ঞান পরাজিত হয়। গণেশের মামা ও মন্দিরের পান্ডারা ভালো করেই জানত যে, গণেশকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুললে তার ‘দেবত্ব’ ঘুচে যাবে। আর দেবত্ব ঘুচে গেলে তাকে সামনে রেখে হাজার হাজার ভক্তের থেকে টাকা রোজগারের যে বিশাল ব্যবসা, তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সচেতন ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে গণেশকে বিজ্ঞানের আলো ও সঠিক চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার।বর্তমান যুগে বিজ্ঞান আমাদের হাতে যে তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম তুলে দিয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করা। কিন্তু গল্পে দেখা যায়, বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়ানোর বদলে আধুনিক প্রচারমাধ্যম (মিডিয়া) এবং তথ্যপ্রযুক্তির অপপ্রয়োগ করা হয়েছে এই অলৌকিকতার গুজবকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। গণেশের অলৌকিক মাহাত্ম্য ইন্টারনেটে ও লোকমুখে এমনভাবে রটানো হলো, যাতে মন্দিরে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে এবং কমিটির ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদকে এখানে অন্ধত্ব প্রসারের হাতিয়ার করা হয়।
মানবিকতার চরম বিপর্যয়।একটি অসুস্থ শিশুর যেখানে প্রয়োজন ছিল নিবিড় চিকিৎসা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাদ্য এবং শৈশবের স্বাভাবিক স্বাধীনতা; সেখানে তাকে দিনরাত সিংহাসনে বসিয়ে রাখা হতো। তার মুখ থেকে চুইয়ে পড়া লালা আর শারীরিক কষ্টকে অন্ধ মানুষ ভাবল ‘দেবতার কৃপা’। বিজ্ঞানের আলো ও ন্যূনতম মানবিকতাবোধকে সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিয়ে এক জ্যান্ত অসুস্থ কিশোরকে খাঁচার পশুর মতো কেবলই উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত করা হলো। তার স্বাভাবিক মানবিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হলো ধর্মের নামে।
জীবনের চরম ও মর্মান্তিক পরিণতি (ট্র্যাজেডি)।প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের নিয়মকে অবহেলা করার চরম ও নিষ্ঠুর মূল্য দিতে হয় গল্পটির শেষভাগে। গণেশের অলৌকিকত্বের বুদবুদ ফেটে যায় অত্যন্ত নির্মমভাবে। তীব্র অ্যাপেন্ডিসাইটিসের যন্ত্রণায় যখন গণেশ ছটফট করতে থাকে, তখনো লোভী পান্ডা ও তার মামা বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিৎসার আশ্রয় নেয়নি। তারা এটিকে জন্ডিস এবং অলৌকিক ক্রোধ বলে ব্যাখ্যা করে এবং অবৈজ্ঞানিক উপায়ে গণেশের পেটে গরম লোহার ছ্যাঁকা দেয়।
বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলা এই নির্যাতনের ফলে গণেশের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। কোনো আরোগ্য বা অপারেশন গণেশের ভাগ্যে জোটেনি; বরং তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও চিকিৎসার চরম অভাবে ছটফট করতে করতে একসময় গণেশের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পর যখন বোঝা যায় "মরা গণেশ" দিয়ে আর ব্যবসা হবে না, তখন অত্যন্ত অবহেলায় তার মৃতদেহটি সৎকারের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, স্বপ্নময় চক্রবর্তী ‘গণেশ’ গল্পের মাধ্যমে এই অমোঘ সত্যটি প্রকাশ করেছেন যে—বিজ্ঞান যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের মানসিকতা যদি কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ও লোভী হয়, তবে বিজ্ঞানের আলো পৌঁছাতে পারে না। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দূরে সরিয়ে রেখে, একটি অসুস্থ শিশুকে দেবতার আসনে বসানোর এই যে পুঁজিবাদী ও সুবিধাবাদী মানসিকতা, তা শেষ পর্যন্ত সেই শিশুটির জীবনকে এক চরম এবং অপরিবর্তনীয় মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। এখানেই লেখকের সার্থকতা।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •
Comments
Post a Comment