Skip to main content

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাথ সাহিত্যের গুরুত্ব ও অবদান আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর/মাইনর।

          বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের আদি-মধ্য পর্বে (বিশেষত তুর্কি আক্রমণ-পরবর্তী যুগসন্ধিক্ষণে) যে কয়েকটি লৌকিক ও ধর্মভিত্তিক সাহিত্যধারা গড়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে **নাথ সাহিত্য** অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিষ্টীয় একাদশ থেকে চতুর্দশ শতকের মধ্যে নাথধর্মকে কেন্দ্র করে এই সাহিত্যের জন্ম। বৈদিক ও পৌরাণিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ দেশজ ও লৌকিক আবহে গড়ে ওঠা এই সাহিত্যধারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও দিকপরিবর্তনকারী সংযোজন।

          ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অন্ধকার যুগের সাহিত্যিক সেতুবন্ধন।বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে তুর্কি আক্রমণের অভিঘাতে ‘অন্ধকার যুগ’ বা ‘বন্ধ্যা যুগ’ বলে অভিহিত করা হতো। দীর্ঘকাল ধারণা ছিল এই সময়ে কোনো সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু নাথ সাহিত্যের আবিষ্কার সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।

 * প্রাচীন যুগের **‘চর্যাপদ’**-এর বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনতত্ত্ব এবং মধ্যযুগের **‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’** বা **‘মঙ্গলকাব্য’**-এর দেবমাহাত্ম্যের মধ্যবর্তী সময়ে নাথ সাহিত্য এক মজবুত সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।

 * এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যেও বাংলার লোকায়ত সাহিত্যচর্চা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়নি।

## ২. সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব: অবৈদিক ও অন্ত্যজ শ্রেণীর জীবনচিত্র

নাথ সাহিত্য কোনো উচ্চবর্ণের বা শাস্ত্রীয় ধর্মের অনুশাসনে তৈরি হয়নি। এটি ছিল তৎকালীন বাংলার অন্ত্যজ ও নিম্নবর্ণের মানুষের নিজস্ব সাহিত্য।

 * **ধর্মীয় সমন্বয়:** নাথ ধর্মে বৌদ্ধ সহজযান, শৈবধর্ম এবং আদিম জাদুটোনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটেছিল। শিব এখানে পরম দেবতা (আদিনাথ), তবে তিনি পৌরাণিক শিব নন—তিনি লৌকিক যোগীশ্বর।

 * **সামাজিক বিদ্রোহ:** ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির জাতপাত ও কৃত্রিম ভেদাভেদের বিরুদ্ধে নাথ সাহিত্য ছিল এক নীরব প্রতিবাদ। সমাজপ্রান্তের সাধারণ মানুষ, হাড়ি, ডোম বা যোগীদের এই সাহিত্যে প্রধান চরিত্র (যেমন: সিদ্ধা হাড়িপা) হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

## ৩. কাহিনীর বৈচিত্র্য ও দুটি প্রধান ধারা

নাথ সাহিত্যের গুরুত্ব বুঝতে গেলে এর দুটি মূল ধারা এবং তাদের অন্তর্নিহিত বার্তা জানা জরুরি:

 * **ক) গোরক্ষবিজয় (গুরু-শিষ্যের আখ্যান):** এই ধারার মূল উপজীব্য হলো গুরু মীননাথের পতন এবং শিষ্য গোরক্ষনাথের দ্বারা তাঁর উদ্ধারসাধন। গুরু মীননাথ কদলী রাজ্যে নারীবিলাসে মগ্ন হয়ে নিজের তত্ত্বজ্ঞান ভুলে যান। শিষ্য গোরক্ষনাথ নর্তকীর বেশে কদলী রাজ্যে প্রবেশ করে ‘অনহদ নাদ’ বা বাদ্যের সংকেতে গুরুকে জাগিয়ে তোলেন।

   > *“শুন গুরু মীননাথ চেতন করহ আপে।/ কত কাল থাকিবে গুরু কদলী প্রতাপে॥”*

   > এই আখ্যানের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে, নারী বা পার্থিব ভোগবিলাসের চেয়ে যোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ কতখানি শ্রেষ্ঠ।

   > 

 * **খ) ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের গান (সংসার ত্যাগের আখ্যান):** এই ধারায় রানী ময়নামতী তাঁর তরুণ পুত্র রাজা গোপীচন্দ্রকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে কঠোর সন্ন্যাস ও যোগদীক্ষা নেওয়ার জন্য বাধ্য করছেন। এখানে মায়ের আদেশে পুত্র তাঁর অপরূপা দুই রানী—অদুনা ও পদুনাকে ছেড়ে হাড়িপার শিষ্যত্ব গ্রহণ করছেন। এটি চরম বৈরাগ্য ও কায়াসাধনার এক অনন্য আলেখ্য।

## ৪. চরিত্র সৃষ্টির অভিনবত্ব ও নারী চরিত্রের রূপান্তর

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে সাধারণত নারীদের পরনির্ভরশীল, কোমল বা মায়াবিনী হিসেবে দেখানো হয়েছে (এমনকি ‘গোরক্ষবিজয়’-এ কদলী রাজ্যের নারীদের সাধনার পরিপন্থী ভাবা হয়েছে)। কিন্তু ‘ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের গান’-এ এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা যায়।

 * **রানী ময়নামতী:** তিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ও জটিল নারী চরিত্র। তিনি কেবল একজন মা নন, তিনি স্বয়ং এক মহাসিদ্ধা ও তত্ত্বজ্ঞানী নারী। পুত্রের প্রতি অন্ধ মোহ কাটিয়ে তাকে পরমার্থিক কল্যাণের পথে ঠেলে দেওয়ার এমন কঠোর ও প্রগতিশীল মাতৃচরিত্র সমগ্র মধ্যযুগে বিরল।

## ৫. লোকনাট্য ও পারফর্মিং আর্টের (Performance) উৎস

নাথ সাহিত্যের কাহিনীগুলো কেবল পুঁথির পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। যুগের পর যুগ ধরে বাংলার ‘যোগী’ বা ‘যুগী’ সম্প্রদায়ের মানুষেরা সারিন্দা বা লাউয়ের দোতারা বাজিয়ে বাড়ি বাড়ি এই গান গেয়ে ভিক্ষা করত।

 * একে **‘যোগীর গান’** বা **‘গোপীচন্দ্রের গান’** বলা হতো।

 * পরবর্তীকালে বাংলার যে লোকনাট্য, পালাগান এবং যাত্রাশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল, তার পরিবেশনরীতির আদি উৎস লুকিয়ে আছে এই নাথ সাহিত্যের গীতি-আলেখ্যের মধ্যে।

## ৬. ভাষাতাত্ত্বিক ও ছন্দগত মূল্য

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাথ সাহিত্যের মূল্য অপরিসীম।

 * **ভাষার বিবর্তন:** চর্যাপদের ‘সান্ধ্যভাষা’ বা অস্পষ্ট আলো-আঁধারির ভাষা কীভাবে বিবর্তিত হয়ে মধ্যযুগের সহজ-সরল ও সাবলীল বাংলায় রূপান্তরিত হচ্ছিল, তার প্রমাণ মেলে নাথ সাহিত্যে।

 * **ছন্দের চলন:** এতে ব্যবহৃত ছড়ার ছন্দ, পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের আদি রূপ পরবর্তীকালের মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলীর ছন্দ নির্মাণে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।

## উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাথ সাহিত্য কেবল এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রচারপুস্তক নয়। এটি বাঙালির লৌকিক জীবনের এক জীবন্ত দলিল। চৈতন্য-পরবর্তী যুগে বাংলায় যখন বৈষ্ণব ধর্মের প্রবল প্লাবন আসে, তখন নাথ সাহিত্যের এই কঠোর যোগমার্গ ও বৈরাগ্যের ধারাটি কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে ঠিকই, কিন্তু বাঙালির মনস্তত্ত্বে এবং লোকসংস্কৃতিতে এর প্রভাব চিরস্থায়ী হয়ে যায়। সাহিত্যিক মূল্যের পাশাপাশি সমাজ ও ভাষার বিবর্তন বুঝতে নাথ সাহিত্য আজও এক অপরিহার্য উপাদান।

*ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পরামর্শ: পরীক্ষায় উত্তর লেখার সময় গোরক্ষবিজয় ও ময়নামতীর কাহিনীর উল্লেখ এবং অন্তত একটি বা দুটি পংক্তি উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করলে উত্তরের মান অনেক বৃদ্ধি পাবে।*


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...