ছেলেবেলা।আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায় - ছেলেবেলা গ্রন্থে অবলম্বনে সেকালের কলকাতার পরিচয় দাও।
ছেলেবেলা।আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায় - ছেলেবেলা গ্রন্থে অবলম্বনে সেকালের কলকাতার পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ছেলেবেলা'গ্রন্থের একেবারে সূচনাতেই কবি লিখেছেন-"আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায়।" তৎকালীন কলকাতার রূপ, মানুষের জীবনযাত্রা এবং পরিবেশ আজকের আধুনিক ও ব্যস্ত কলকাতার চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। 'ছেলেবেলা' অনুসরণে সেই সেকালের কলকাতার এক বাস্তব ও মনোরম পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
•ধীরগতির যাতায়াত ও যানবাহন। সেকালের কলকাতায় আজকের মতো তীব্র যানজট, হর্ন বা যান্ত্রিক কোলাহল ছিল না। যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি এবং পালকি।রাস্তায় খুব কমই ঘোড়ার গাড়ি চলত এবং সেগুলোর চাবুকের আওয়াজ ও ধুলো উড়িয়ে যাওয়া দূর থেকেই টের পাওয়া যেত।তবে-
বিত্তশালী বা সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষদের চলাচলের জন্যও পালকিব্যবহৃত হতো।রাস্তাঘাট ছিল কাঁচা বা ইট বিছানো, আর সেগুলোতে নিয়মিত ঝাঁট দেওয়া হতো না।
•আলো ও জলের ব্যবস্থা।আজকের মতো ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ বা কলের জলের সুব্যবস্থা সেকালে ছিল না।ছিল সাঁঝবাতি ও কেরোসিন।সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে জ্বালানো হতো রেড়ির তেলের প্রদীপ বা কেরোসিনের লণ্ঠন। রাস্তার গ্যাসবতি জ্বালানোর জন্য সন্ধ্যায় আলোওয়ালা লম্বা লাঠি হাতে হেঁটে যেত।এছাড়াও-
তখন ঘরে ঘরে জল সরবরাহের আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না। পানীয় জলের জন্য প্রধান ভরসা ছিল গঙ্গার জল বা নদীর জল, যা ভিস্তি (চামড়ার থলিতে জল বহনকারী কর্মী) পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দিত।
•শান্ত ও নীরব পরিবেশ।সেকালের কলকাতার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্ত ও ধীরগতির।শহরের বাতাস ছিল ধোঁয়া ও দূষণমুক্ত।দুপুরে বা বিকেলে চারিদিক এতটাই নিস্তব্ধ থাকত যে, দূরে ফেরিওয়ালার ডাক কিংবা গাছের পাতায় বাতাসের দোলা দেওয়ার শব্দও স্পষ্ট শোনা যেত।
•প্রাত্যহিক জীবন ও ফেরিওয়ালা।সেকালের কলকাতায় কেনাকাটার জন্য আধুনিক শপিং মল বা বাজারের আধিক্য ছিল না। পাড়ার অলিগলিতে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাকই ছিল দৈনন্দিন জীবনের প্রধান অঙ্গ।চুরিওয়ালা, পেয়ারাওয়ালা, চিনির বাসনে তৈরি খেলনাওয়ালা, তিলকুট ও আইসক্রিমওয়ালারা হেঁকে হেঁকে জিনিস বিক্রি করত।তাদের সেই বৈচিত্র্যময় ডাক বালক রবির মনের গভীরে এক অন্যরকম সুর ও রোমাঞ্চ তৈরি করত।
•সমাজ ও ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল।সেকালের সামাজিক জীবনও ছিল বেশ কড়া এবং নিয়মকানুনে বাঁধা।বড়দের কড়া শাসন ও যৌথ পরিবারের প্রথা ছিল বেশ জোরদার।ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে শিশুদের স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ কম ছিল। ভৃত্যদের (কাজের লোকদের) কড়া পাহারায় শিশুদের দিন কাটত।আসলে-
'ছেলেবেলা' গ্রন্থে আঁকা সেকালের কলকাতা ছিল যান্ত্রিকতাহীন, ধীরগতির এবং শান্ত এক শহর—যেখানে প্রযুক্তির চাকচিক্য না থাকলেও ছিল এক গভীর সাবলীলতা ও রহস্যময়তার স্পর্শ।
Comments
Post a Comment