Skip to main content

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র আলোচনা করো।

৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ দশম শ্রেণি দ্বিতীয় সেমিস্টার ইতিহাস।

       ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহের চরিত্র বা প্রকৃতি নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে তীব্র মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে নিছক সিপাহি বিদ্রোহ বলেছেন, আবার কেউ এটিকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর সেখানে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র হলো-

      •সিপাহি বিদ্রোহ।ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ স্যার জন লরেন্স, চার্লস রেইকস, স্যার জন কে এবং ভারতীয় শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, কিশোরীচাঁদ মিত্র প্রমুখ এই বিদ্রোহকে ‘কেবলমাত্র সিপাহিদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ’বা ‘সিপাহি বিদ্রোহ’হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

          এনফিল্ড রাইফেলের টোটো ব্যবহার কেন্দ্র করে বিদ্রোহের সূচনা হলেও, পরবর্তীতে এটি সিপাহিদের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি শুধু সিপাহি বিদ্রোহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

     • সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া।রজনীপাম দত্ত, অধ্যাপক সুশোভন সরকার প্রমুখ ইতিহাসবিদের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল ‘সামন্তশ্রেণীর শেষ আর্তনাদ’বা একটি সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া।আবার-

         লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি ও বাজেয়াপ্ত নীতির কারণে নানা সাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ প্রমুখ দেশীয় রাজা ও জমিদাররা তাঁদের হারানো ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য এতে যোগ দেন।

       •ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।জাতীয়তাবাদী নেতা বি. ডি. সাভারকর (বিনায়ক দামোদর সাভারকর) তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে এই ঘটনাকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন।যেখানে-

         বিদ্রোহীরা বিদেশি শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। তবে অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদ এই মত পুরোপুরি গ্রহণ করেন না, কারণ তখন সমগ্র ভারতে আধুনিক জাতীয়তাবোধের সূচনা হয়নি।

      •জাতীয় বিদ্রোহ।ব্রিটিশ রাজনীতিক বেঞ্জামিন ডিসরেলি, দার্শনিক কার্ল মার্ক্স এবং পরবর্তীতে ইতিহাসবিদ প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত এই সংগ্রামকে ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।তবে সেখানে সেদিন-

        অবধ, ঝাঁসি, কানপুর ও বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং কৃষক শ্রেণী সিপাহিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।

      •কৃষক ও গণবিদ্রোহ।আধুনিক গবেষক ড. রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায়, ড. এরিক স্টোকস এবং তপতি রায় দেখিয়েছেন যে, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের অত্যধিক ভূমিরাজস্ব এবং শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে কৃষক ও সাধারণ প্রজারা ব্যাপক সংখ্যায় এতে যোগ দেয়। ফলে এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহের রূপ নেয়।

        আলোচনার সব শেষে আমাদের বলতেই হয় যে, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে একক কোনো সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ করা কঠিন। এটি সূচনা পর্বে সামরিক অসন্তোষ বা সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হলেও, সময়ের সাথে সাথে এতে সামন্তপতি, কৃষক ও সাধারণ জনতার অংশগ্রহণ একে একটি ব্যাপক গণবিদ্রোহ ও সর্বভারতীয় অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট (সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী) সংগ্রামের রূপ দিয়েছিল।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...