Skip to main content

নব্য প্রস্তর যুগ এবং তাম্রপ্রস্তর যুগের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো।

নব্য প্রস্তর যুগ এবং তাম্রপ্রস্তর যুগের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।

১)নব্য প্রস্তর যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (Features of the Neolithic Age)

      আমরা জানি যে,মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসে নব্য প্রস্তর যুগ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ – খ্রিস্টপূর্ব ১০০০) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঐতিহাসিক গর্ডন চাইল্ড এই যুগের বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে "নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লব" (Neolithic Revolution) বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো-

     •খাদ্য উৎপাদক অর্থনীতিঃএই যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ 'খাদ্য সংগ্রহকারী' থেকে 'খাদ্য উৎপাদকে' পরিণত হয়। মানুষ নিয়মতান্ত্রিকভাবে কৃষিকাজ শুরু করে। ফলে বার্লি, গম, ধান ও বিভিন্ন ধরনের ডাল উৎপাদন সম্ভব হয়।

       •স্থায়ী বসবাস ও গ্রাম্য জীবনঃ কৃষিকাজের সূত্র ধরে মানুষ যাযাবর জীবন ত্যাগ করে ফসলের ক্ষেতের কাছাকাছি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কাদা, খড় এবং রোদে পোড়ানো ইট দিয়ে তারা বাড়িঘর তৈরি করে। এভাবেই মানব ইতিহাসের প্রথম স্থায়ী গ্রামীণ সভ্যতার বিকাশ ঘটে।

      •উন্নত ও মসৃণ পাথরের হাতিয়ারঃ এই যুগে পাথরের হাতিয়ার তৈরির কৌশলে বিশাল পরিবর্তন আসে। পুরানো খসখসে অস্ত্রের বদলে মানুষ এখন পাথরকে ঘষে মসৃণ, ধারালো এবং চকচকে করে তোলে। কুঠার, বাটালি, কাস্তে এবং নোড়া-নোড়ির মতো উন্নত হাতিয়ার এই যুগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।

      •মৃৎশিল্পের বিকাশঃ উদ্বৃত্ত শস্য মজুত রাখা এবং রান্নার প্রয়োজনে এই যুগে মৃৎশিল্প বা মাটির পাত্র তৈরির সূচনা হয়। প্রথম দিকে হাতে মাটির পাত্র তৈরি হলেও, পরবর্তীকালে কুমোরের চাকা আবিষ্কার এই শিল্পে বিপ্লব এনে দেয়।

        •পশুপালনঃ শিকারের পাশাপাশি মানুষ গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি করে। গরু, ছাগল, ভেড়া এবং শূকর প্রতিপালন করা হতো মাংস, দুধ এবং চামড়ার প্রয়োজনের জন্য।

      •সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনাঃস্থায়ীভাবে বসবাসের ফলে সমাজে যৌথ পরিবার এবং গোষ্ঠীর ধারণা তৈরি হয়। উদ্বৃত্ত শস্যের ওপর ভিত্তি করে আদিম শ্রম বিভাজন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা জন্ম নেয়। পাশাপাশি, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি ও মাতৃদেবীর (Mother Goddess) পূজার প্রচলন ঘটে।

      •গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলঃ ভারতের মেহেরগড় (বলুচিস্তান), বুর্জাহোম ও গুফকরাল (কাশ্মীর), কোলডিহওয়া (উত্তর প্রদেশ) এবং পশ্চিমবঙ্গের ভরতপুর ও পান্ডু রাজার ঢিবি (বর্ধমান)।

২)তাম্রপ্রস্তর যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (Features of the Chalcolithic Age)

        নব্য প্রস্তর যুগের শেষভাগে মানুষ পাথরের পাশাপাশি ধাতুর ব্যবহার শেখে। মানব ইতিহাসে প্রথম ব্যবহৃত ধাতু ছিল তামা। পাথর ও তামা-এই দুই উপাদানের সহাবস্থানের কারণে এই যুগকে তাম্রপ্রস্তর যুগ বলা হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো-

       •ধাতুর প্রথম ব্যবহারঃ এই যুগের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো তামার আবিষ্কার ও ব্যবহার। তামা গলিয়ে মানুষ কুঠার, তলোয়ার, বল্লম ও চুরির মতো ধারালো অস্ত্র এবং নানা ধরনের অলঙ্কার তৈরি করতে শুরু করে। তবে তামার পাশাপাশি পাথরের তৈরি ক্ষুদ্রাস্ত্র বা 'মাইক্রোলিথ'-এর ব্যবহারও সমানভাবে চালু ছিল।

       •কৃষি ও মিশ্র অর্থনীতিঃ তাম্রপ্রস্তর যুগের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি এবং পশুপালন। তারা গম, বার্লি, মসুর ডাল এবং বিশেষ করে ধান চাষ করত। নদী তীরবর্তী উর্বর উপত্যকায় চাষবাস ভালো হতো। শিকার ও মাছ ধরাও জীবিকার অংশ ছিল।

       •চিত্রিত মৃৎশিল্পঃএই যুগের মৃৎশিল্প ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও উন্নত। সাধারণত **কালো এবং লাল রঙের মৃৎপাত্র (Black and Red Ware)** এই যুগে বেশি দেখা যেত। পাত্রগুলির গায়ে চাকা, হরিণ, ফুল বা জ্যামিতিক নকশা আঁকা থাকত।

       •আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশঃ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই যুগে আলাদা আলাদা আঞ্চলিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। যেমন—

      আহার সংস্কৃতি-রাজস্থান।মালব সংস্কৃতি-মধ্যপ্রদেশ (নভদাতোলি, এরান)।জোরওয়ে সংস্কৃতি-মহারাষ্ট্র (ইনাইমগাঁও, দৈমাবাদ)।

       •বাণিজ্য ও যোগাযোগঃ এই যুগে দূরবর্তী অঞ্চলের সাথে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যের সূত্রপাত ঘটে। তামা, মূল্যবান পাথর ও মৃৎপাত্রের আদান-প্রদান হতো। যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য গরুর গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়।

      •সামাজিক বৈষম্যের সূচনাঃঘরবাড়ির আকার এবং সমাধিস্থল থেকে প্রাপ্ত অলঙ্কারের তারতম্য থেকে বোঝা যায় যে সমাজে ধনী-দরিদ্র বা শাসক-শাসিতের মতো সামাজিক স্তরবিন্যাস ও বৈষম্যের সূচনা এই যুগেই ঘটেছিল।

      •গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলঃনবদাতোলি (মধ্যপ্রদেশ), ইনামগাঁও (মহারাষ্ট্র), গিলুন্দ (রাজস্থান) এবং পশ্চিমবঙ্গের মঙ্গলকোট (বর্ধমান) ও মহিষদল (বীরভূম)।

    •নব্য প্রস্তর ও তাম্রপ্রস্তর যুগের মধ্যে মূল পার্থক্।•

• নব্য প্রস্তর যুগে  সম্পূর্ণভাবে পাথর ও হাড়ের তৈরি হাতিয়ার। কিন্তু -

      তাম্র প্রস্তর যুগে পাথর এবং তামা (ধাতু) উভয়ের ব্যবহার ছিল।

      • নব্য প্রস্তর যুগে মূলত সাধারণ ও একরঙা মাটির পাত্র।কিন্তু -

      তাম্র প্রস্তর যুগে চিত্রিত এবং উন্নত 'কালো ও লাল' মৃৎপাত্র। |

      •নব্য প্রস্তর যুগে সম্পূর্ণ গ্রামীণ ও প্রাথমিক কৃষিভিত্তিক।কিন্তু-

      গ্রামীণ হলেও কিছু ক্ষেত্রে নগর সভ্যতার (যেমন সিন্ধু সভ্যতা) ভিত্তি স্থাপনকারী। 

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...