Skip to main content

কিন্তু কেবল অতীত বর্তমান নহে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অতল স্পর্শ বিরহ মৃত্যুর প্রবন্ধে অতল স্পর্শ বিরহ"-মেঘদূত প্রবন্ধে অতলস্পর্শ বিরহের যে বাকপ্রতিমা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃষ্টি করেছেন তা ব্যাখ্যা করো

মেঘদূত প্রবন্ধ।"কিন্তু কেবল অতীত বর্তমান নহে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অতল স্পর্শ বিরহ মৃত্যুর প্রবন্ধে অতল স্পর্শ বিরহ"-মেঘদূত প্রবন্ধে অতলস্পর্শ বিরহের যে বাকপ্রতিমা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃষ্টি করেছেন তা ব্যাখ্যা করো।ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত 'মেঘদূত' প্রবন্ধে মহাকবি কালিদাসের 'মেঘদূত' কাব্যকে অবলম্বন করে মানব-হৃদয়ের এক চিরন্তন ও গভীর অনুভূতির কথা বলেছেন। আপনার উদ্ধৃত অংশটি"কিন্তু কেবল অতীত বর্তমান নহে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অতলস্পর্শ বিরহ"সেই ভাবনারই মূল সুর।এখানে রবীন্দ্রনাথ যে 'অতলস্পর্শ বিরহ'-এর বাকপ্রতিমা (চিত্রকল্প বা রূপক) তৈরি করেছেন, তার অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যাটি নিচে আলোচনা করা হলো। যেখানে আমারা দেখি-

      ভৌগোলিক দূরত্ব বনাম মানস দূরত্ব। কালিদাসের কাব্যে যক্ষ ও অলকাপুরীর যক্ষপ্রিয়ার মধ্যে দূরত্ব ছিল ভৌগোলিক—রামগিরি পর্বত থেকে অলকাপুরী। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একে স্থান-কালের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের অন্তরের চিরন্তন দূরত্বে রূপান্তর করেছেন। তাঁর মতে, বিরহ কেবল যক্ষ ও যক্ষবধূর নয়; এই বিরহ প্রত্যেকটি মানুষের অন্তরের গভীরের একাকীত্ব। আমরা সবাই নিজের নিজের মানস-অলকাপুরী থেকে নির্বাসিত।

       মানুষের চিরন্তন একাকীত্ব ও সংযোগের অভাব।মানুষ সমাজে সবার মাঝে বাস করলেও, প্রত্যেকে নিজের ভেতরে সম্পূর্ণ একা। এক মানুষের অন্তরের গভীরতম ভাব, বেদনা বা আকুলতা অন্য মানুষ হুবহু অনুধাবন করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

"আমি যাহার জন্য কাঁদিয়া মরিতেছি সে আমার পাশেই আছে, অথবা সে আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের সমস্ত সুখদুঃখের একমাত্র সঙ্গিনী-তবুও তাহার এবং আমার মাঝখানে একটি অতলস্পর্শ বিরহ।"

         এই যে পাশাপাশি থেকেও পরস্পরের মনকে পুরোপুরি ছুঁতে না পারা, দুই আত্মার মাঝখানের এই দুর্ভেদ্য প্রাচীরটিই হলো 'অতলস্পর্শ বিরহ'। এর কোনো তল নেই, একে কোনো পার্থিব মিলন দিয়ে সম্পূর্ণ ভরাট করা যায় না।

        নিখিল মানবহৃদয়ের মেঘদূত।কালিদাসের যক্ষ যেমন আষাঢ়ের মেঘকে দূত করে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের মতে, যুগে যুগে কবিরা এবং সাধারণ মানুষও তাদের অন্তরের এই অতলস্পর্শ বিরহবেদনা প্রকাশ করার জন্য ব্যাকুল হয়। মেঘ এখানে কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, তা হলো মানুষের ভেতরের অব্যক্ত ক্রন্দন ও আকাঙ্ক্ষার রূপক। বর্ষার মেঘ দেখে আমাদের মনে যে এক অদ্ভুত উদাসীনতা ও ব্যাকুলতা তৈরি হয়, তা আসলে আমাদের ভেতরের এই চিরন্তন বিরহী সত্তারই জাগরণ।

        আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবের ব্যবধান। মানুষ যা চায় এবং যা পায়, তার মধ্যে একটা চিরন্তন ব্যবধান থেকে যায়। আমাদের কল্পনা বা আকাঙ্ক্ষা অসীম, কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবন সীমাবদ্ধ। এই অসীমের প্রতি সসীমের যে চিরকালের আর্ত্তি এবং অপূর্ণতা, রবীন্দ্রনাথ তাকেই এই প্রবন্ধে একটি অতল সমুদ্রের গভীরতার সাথে তুলনা করে 'অতলস্পর্শ' বলেছেন।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ 'মেঘদূত' প্রবন্ধে কালিদাসের কাব্যকে এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর সৃষ্টি করা এই 'অতলস্পর্শ বিরহ'আসলে কোনো নির্দিষ্ট প্রেমিক-প্রেমিকার সাময়িক বিচ্ছেদ নয়, বরং তা হলো মানুষের অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক চিরন্তন একাকীত্ব, অপূর্ণতা এবং অপরকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়ার এক আকুল ও চির-অসমাপ্ত চেষ্টা।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট ও Shesher kabita Sundarbon youtube Channel 🙏


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...