Skip to main content

শিক্ষার কার্যাবলী আলোচনা করো।

শিক্ষার কার্যাবলী আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।ইউনিক১

           আমরা জানি যে,শিক্ষা হলো একটি গতিশীল ও জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া, যা মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটায়। মানবসভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত সমাজ ও ব্যক্তির উন্নয়নে শিক্ষা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে আসছে। বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষার কার্যাবলীকে প্রধানত দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যায়-

১.ব্যক্তিতান্ত্রিক কার্যাবলী এবং-

২.সমাজতান্ত্রিক কার্যাবলী।

১. শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক কার্যাবলী (Individual Functions of Education)

        শিক্ষার প্রাথমিক ও প্রধান কাজ হলো ব্যক্তির নিজস্ব গুণাবলী ও ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো। এই প্রসঙ্গে কার্যাবলীগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-

      •অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশঃস্বামী বিবেকানন্দের মতে, "শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ।"প্রতিটি শিশুর মধ্যে কিছু সুপ্ত সম্ভাবনা বা প্রতিভা থাকে। শিক্ষা সেই সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত ও বিকশিত করতে সাহায্য করে।

      •সামগ্রিক বা সর্বাঙ্গীন বিকাশঃ শিক্ষার অন্যতম কাজ হলো শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, বৈদ্ধিক, প্রাক্ষোভিক (Emotional) এবং আধ্যাত্মিক দিকের সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ ঘটানো। মহাত্মা গান্ধীর ভাষায়, শিক্ষা হলো মানুষের দেহ, মন ও আত্মার সর্বোত্তম বিকাশ।

        •চরিত্র গঠনঃ শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষার্থীর নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। আদর্শ আচরণ, সততা, শৃঙ্খলা ও সহানুভূতির মতো গুণাবলী শিক্ষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।

       •অভিযোজন বা সংগতিবিধানঃ পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই হলো সংগতিবিধান। শিক্ষা মানুষকে বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে এবং পরিবর্তিত সমাজ ও পরিবেশের সঙ্গে সফলভাবে অভিযোজন করতে শেখায়।

 স্বনির্ভরতা ও বৃত্তিমূলক প্রস্তুতিঃ আধুনিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। শিক্ষা শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করে কোনো না কোনো বৃত্তির বা পেশার যোগ্য করে তোলে।

২. শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক কার্যাবলী (Social Functions of Education)

          ব্যক্তির বিকাশের পাশাপাশি সমাজের অগ্রগতি, সংস্কৃতি রক্ষা ও রূপান্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। সমাজবিজ্ঞানী জন ডিউই (John Dewey)-র মতে-

 "শিক্ষা হলো সমাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাধ্যম।" সমাজতান্ত্রিক কার্যাবলীগুলি নিম্নরূপ:

       ••সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও সঞ্চালনঃ প্রতিটি সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ থাকে। শিক্ষা এক প্রজন্মের সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত করে তা বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

      •সামাজিকীকরণঃ শিক্ষা শিশুকে সমাজের একজন দায়িত্বশীল ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। সমাজের নিয়মকানুন, কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলার প্রক্রিয়াই হলো সামাজিকীকরণ, যা শিক্ষার অন্যতম প্রধান কাজ।

       •সামাজিক নিয়ন্ত্রণঃ সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সংহতি বজায় রাখার জন্য শিক্ষা পরোক্ষভাবে কাজ করে। এটি কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক অপরাধ দূর করে মানুষকে আইন ও নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।

        •সামাজিক প্রগতি ও পরিবর্তনঃ সমাজ স্থবির নয়, পরিবর্তনশীল। শিক্ষা সমাজকে গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে নতুন ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার জন্ম দেয়। নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে শিক্ষা সামাজিক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয়।

     •জাতীয় সংহতি ও বিশ্বজনীন চেতনাঃ ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে শিক্ষার একটি বড় কাজ হলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে জাতীয় সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা। একই সঙ্গে শিক্ষা মানুষকে আন্তর্জাতিকতাবোধ ও বিশ্বনাগরিকের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।

৩. শিক্ষার অন্যান্য আধুনিক কার্যাবলী

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে শিক্ষার কিছু নতুন মাত্রিক কার্যাবলী যুক্ত হয়েছে-

      •মানবসম্পদ উন্নয়নঃ একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার জনসংখ্যা নয়, বরং দক্ষ জনসংখ্যা। শিক্ষা সাধারণ মানুষকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরিত করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করে।

      •গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশঃ ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের ভোটাধিকার, বাক-স্বাধীনতা ও কর্তব্যের গুরুত্ব বোঝাতে শিক্ষা সাহায্য করে। যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম কাজ।

             পরিশেষে বলা যায় যে, শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কার্যাবলী একে অপরের পরিপূরক। ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে যেমন সমাজ কল্পনা করা যায় না, তেমনই সমাজ ছাড়া ব্যক্তির বিকাশ অসম্ভব। শিক্ষা একদিকে যেমন ব্যক্তিকে স্বনির্ভর, চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, অন্যদিকে তেমনই সমাজকে প্রগতিশীল, সুশৃঙ্খল ও সংস্কৃতির ধারক করে তোলে। তাই বলা যায়, শিক্ষার চূড়ান্ত কাজ হলো ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করা।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...