Skip to main content

সুচেতনা। "এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রম মুক্তি হবে...।" গভীর আশাবাদ এবং জন্মান্তরবাদ কিভাবে অন্তহীন অন্বেষণের পথে ক্রমমুক্তি ঘটাবে- সুচেতনা কবিতাটি অবলম্বনে ব্যাখ্যা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।


 জীবনানন্দ দাশের 'সুচেতনা' কবিতাটি মূলত চেতনা ও অবচেতনার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, যেখানে সময়ের চরম অবক্ষয় ও হিংস্রতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কবি এক শাশ্বত শুভচেতনার সন্ধান করেছেন। এই অন্তহীন অন্বেষণের পথেই কবির গভীর আশাবাদ এবং জন্মান্তরবাদের ভাবনা একাকার হয়ে 'ক্রমমুক্তি'র রূপরেখা তৈরি করেছে।

নিচে উদ্ধৃতিসহ এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

## ১. গভীর আশাবাদ: ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ও উত্তরণের বিশ্বাস

কবিতার পটভূমিতে রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীর চরম হতাশা, হিংসা আর রক্তপাত। কবি দেখছেন মানুষের তৈরি ইতিহাস রক্তপাতে কলঙ্কিত। কিন্তু এই অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সুচেতনার কাছে কবির প্রার্থনা এক গভীর আশাবাদের জন্ম দেয়। কবি বিশ্বাস করেন, বর্তমানের এই পাপ ও পঙ্কিলতাই মানুষের শেষ গন্তব্য নয়। মানুষ নিজের ভুল ও রক্তের দায় চুকিয়ে একদিন আলোর পথে ফিরবেই।

এই গভীর আশাবাদকে ব্যক্ত করতে কবি লিখেছেন:

> "আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে প্রাণ

> পৃথিবীর মানুষেরা পেতেছে যে শ্মশানের ঘ্রাণ,

> তবুও তোমার কাছে অমরতা ক’রেছে আহ্বান।"

এখানে 'শ্মশানের ঘ্রাণ' বর্তমানের ধ্বংসাত্মক রূপকে প্রকাশ করলেও সুচেতনার 'অমরতা'র আহ্বান প্রমাণ করে যে, মানুষের ভেতরের শুভবোধ কখনো মরে যায় না। এই শাশ্বত শুভবোধই কবিকে আশান্বিত করে তোলে যে, মানুষ একদিন তার সমস্ত কলুষতা মুছে ফেলে মুক্তির আলোয় পৌঁছাবে।

## ২. জন্মান্তরবাদ ও অন্তহীন অন্বেষণ

জীবনানন্দ দাশের এই কবিতায় জন্মান্তরবাদ বা যুগ-যুগান্তরের প্রবাহ কোনো ধর্মীয় অর্থ বহন করে না; বরং তা হলো মানুষের চেতনার বিবর্তন ও সত্যের নিরবচ্ছিন্ন অন্বেষণ। কবি বোঝেন, মানুষের এই মুক্তি বা রূপান্তর এক দিনে বা এক জনমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শত শত বছরের সাধনা এবং বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা।

বর্তমান সময়ের পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি পেতে হলে চেতনাকে প্রসারিত করতে হবে সুদূর অতীতে এবং সুদূর ভবিষ্যতে। এই দীর্ঘ সময়ের পরিব্রাজনকে ফুটিয়ে তুলতে কবি জন্মান্তরবাদের আশ্রয় নিয়ে বলেছেন:

> "অনেক জনম ধ’রে ক’রেছি যে অন্বেষণ তার,

> নক্ষত্রের আলোয় আলোয়

> গভীর আঁধারে।"

এই 'অনেক জনম' ধরে অন্বেষণ আসলে মানুষের শুভবোধের এক ধারাবাহিক যাত্রা। এক জনমে যে আলোর সন্ধান সম্পূর্ণ হয় না, তা পরবর্তী জনমে, পরবর্তী যুগে মানুষ আবার খুঁজতে শুরু করে। নক্ষত্রের আলো আর গভীর আঁধারের মধ্য দিয়ে মানুষের এই যে যাত্রা, তা-ই চেতনার ক্রমবিকাশ ঘটায়।

## ৩. জন্মান্তরবাদ ও আশাবাদের মিলনে 'ক্রমমুক্তি'

কবির এই জন্মান্তরবাদী ধারণা এবং গভীর আশাবাদ— এই দুটি ধারা এসে মিলেছে 'ক্রমমুক্তি'র মোহনায়। কবি জানেন, আজকের মানুষ হিংস্র ও ক্রূর। কিন্তু এই মানুষই বহু জনমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, ভুলের মাশুল দিতে দিতে একদিন প্রকৃত 'মানুষ' হয়ে উঠবে। এই পথটি কঠিন এবং দীর্ঘ, কিন্তু এই পথেই আলো জ্বলবে।

পৃথিবীর এই রূপান্তর হঠাৎ অলৌকিক উপায়ে হবে না, তা হবে 'ক্রমে ক্রমে' বা ধাপে ধাপে— মানুষের চেতনার উত্তরণের মাধ্যমে। তাই কবি সমস্ত রক্তপাত ও অন্ধকারকে মেনে নিয়েও পরম শান্তিতে উচ্চারণ করতে পারেন—

> "এই পথে আলো জ্বেলে— এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;

> সে-অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;"

**উপসংহার:**

সুতরাং, 'সুচেতনা' কবিতায় জন্মান্তরবাদ কোনো আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, বরং তা হলো মানবসভ্যতার ক্রমাগত পরিশুদ্ধ হওয়ার এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আর কবির আশাবাদ হলো সেই চালিকাশক্তি, যা মানুষকে এই দীর্ঘ পথ চলায় ক্লান্তিহীন রাখে। বহু শতাব্দীর মনীষা ও সাধনার আলো জ্বেলে, বহু জনমের ভুলত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর এই অন্তহীন অন্বেষণ 'ক্রমমুক্তি'র দিকে এগিয়ে যাবে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...