সঙ্গতিবিধান। ভালো বা উত্তম সঙ্গতি বিধানের শর্তগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।
• ভালো বা উত্তম সংগতি বিধান (Good Adjustment)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলতে পারি-সংগতিবিধান বা অ্যাডজাস্টমেন্ট হলো একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বাহ্যিক পরিবেশের প্রতিকূলতার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বজায় রাখে। যখন কোনো ব্যক্তি মানসিক চাপ, দ্বন্দ্ব বা হতাশার মুখে না পড়ে তার চারপাশের সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পরিবেশের সাথে সফল ও স্বাস্থ্যকরভাবে মানিয়ে নিতে পারে, তখন তাকে উত্তম বা ভালো সংগতি বিধান বলা হয়।আসলে এটি সুসংহত ব্যক্তিত্ব এবং সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। আর এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি-
•উত্তম সংগতি বিধানের প্রধান শর্ত বা লক্ষণসমূহ
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন ব্যক্তির সংগতি বিধান কতটা 'উত্তম' বা 'ভালো' তা কিছু নির্দিষ্ট শর্ত, মানসিক লক্ষণ এবং আচরণের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হয়। এই প্রধান শর্তগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-
১) আত্মসচেতনতা এবং আত্মস্বীকৃতিঃউত্তম সংগতি বিধানের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো ব্যক্তি নিজের শক্তি, সামর্থ্য, সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকবে। সে অবাস্তব কল্পনার জগতে বাস না করে নিজের বাস্তব রূপটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ বা স্বীকার (Accept) করবে।
২)পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত জ্ঞানঃ ভালো সংগতি বিধানকারী ব্যক্তি বাস্তব জগত এবং পরিবেশকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। তিনি অবান্তর কুসংস্কার বা অলীক ভাবনায় বিশ্বাসী না হয়ে, চারপাশের পরিস্থিতিকে যুক্তিসঙ্গত ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করেন।
৩) আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিপক্কতাঃ উত্তম সংগতি বিধানের একটি অন্যতম শর্ত হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা। ভয়, রাগ, হিংসা বা অতিরিক্ত আনন্দের মুহূর্তে এই ধরণের ব্যক্তিরা নিজেদের মানসিক ভারসাম্য হারান না। তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৪)সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাঃ কোনো কঠিন সমস্যা বা বাধার সম্মুখীন হলে ভালো সংগতি বিধানকারী ব্যক্তিরা ভয়ে পিছিয়ে যান না বা পরোক্ষ প্রতিরক্ষণ কৌশলের (যেমন—অজুহাত দেখানো বা অন্যের ওপর দোষ চাপানো) আশ্রয় নেন না। তারা প্রত্যক্ষ কৌশল ব্যবহার করে সচেতনভাবে সমস্যার মুখোমুখি হন এবং তা সমাধানের বাস্তব পথ খোঁজেন।
৫) সামাজিক সামঞ্জস্য ও সুসম্পর্কঃ মানুষ সামাজিক জীব। উত্তম সংগতি বিধানের জন্য সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা জানানো, সহমর্মিতা প্রকাশ এবং দলের সাথে মিলেমিশে কাজ করার ক্ষমতা (Teamwork) ভালো সংগতি বিধানের পরিচয় দেয়।
৬) নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যমুখীনতাঃ সুসংগত ব্যক্তির জীবনের একটি নির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং অর্জনযোগ্য লক্ষ্য থাকে। তিনি সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে পরিশ্রম করেন। কোনো সাময়িক ব্যর্থতায় তিনি ভেঙে পড়েন না, বরং লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকেন।
৭) মানসিক দ্বন্দ্ব ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তিঃ যিনি ভালো সংগতি বিধান করতে পারেন, তাঁর মনে দীর্ঘস্থায়ী কোনো মানসিক দ্বন্দ্ব (Conflict), হীনমন্যতা (Inferiority Complex) বা তীব্র অপরাধবোধ থাকে না। তিনি অতীতের ব্যর্থতা ভুলে বর্তমানকে উপভোগ করতে পারেন এবং ভবিষ্যতের দিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকান।
•শিক্ষাক্ষেত্রে এর তাৎপর্য (Educational Significance)
বিদ্যালয় স্তরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তম সংগতি বিধানের এই শর্তগুলি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানে আমরা দেখি-
•উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি:বিদ্যালয়ে এমন একটি গণতান্ত্রিক ও আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে নিজেদের প্রকাশ করতে পারে।
•সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী: খেলাধুলা, নাটক, বিতর্ক বা স্কাউটের মতো কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ ও আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ শেখানো যায়।
•নির্দেশনা ও পরামর্শদান: যে সমস্ত শিক্ষার্থী অপসংগতি (Maladjustment)-র শিকার, তাদের চিহ্নিত করে সঠিক গাইডেন্স ও কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করা উচিত।
পরিশেষে বলা যায় যে, উত্তম সংগতি বিধান কেবল পরিবেশের সাথে আপস করা নয়, বরং নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পরিবেশের বাস্তবতার মধ্যে একটি সুষম ও গতিশীল ভারসাম্য রক্ষা করা। এটি ব্যক্তির সামগ্রিক বিকাশ এবং জীবনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundorbon YouTube channel SAMARESH sir 🙏
Comments
Post a Comment