"জগতের উপর মনের কারখানা বসিয়েছে এবং মনের উপর বিশ্বমনের কারখানা, সেই উপর তলা হইতে সাহিত্যের উৎপত্তি"— মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর **‘সাহিত্যের সামগ্রী’** প্রবন্ধে সাহিত্য সৃষ্টির মনস্তাত্ত্বিক ও নান্দনিক রূপরেখা অঙ্কন করতে গিয়ে আলোচ্য মন্তব্যটি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্য কেবল বাস্তব জগতের হুবহু অনুকরণ বা বিবরণ নয়; আবার তা কেবল ব্যক্তিগত মনের খামখেয়ালি আবেগও নয়। বাহ্যিক রূপ-রস-গন্ধময় বস্তুজগৎ কীভাবে মানুষের মনের গভীরে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে তা কীভাবে বিশ্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করে সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করে—আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে সেই গূঢ় তত্ত্বটিই অত্যন্ত সুন্দর এক রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
### ১. প্রথামতলা: "জগতের উপর মনের কারখানা"
আমাদের চারপাশে বিস্তৃত যে বস্তুজগৎ বা বাহ্য প্রকৃতি রয়েছে, তা রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ ও স্পর্শে ভরা। কিন্তু এই বাহ্যিক জগৎ নিজে থেকে সাহিত্য তৈরি করতে পারে না।
* **বস্তুজগতের রূপান্তর:** মানুষ তাঁর পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে বাইরের জগতের উদ্দীপনা গ্রহণ করে। কিন্তু মানবমন কেবল সেই তথ্য বা অভিজ্ঞতা জমা করার নিষ্ক্রিয় পাত্র নয়। মন হলো একটি **"কারখানা"** বা প্রসেসিং ইউনিট।
* **ভাবের সংযোজন:** বস্তুজগৎ যা দেয়, মানবমন নিজের রাগ-অনুরাগ, আনন্দ-বেদনা এবং কল্পনার রঙে তাকে নতুন করে গড়ে তোলে। যেমন—প্রকৃতিতে ফুল ফোটা একটি প্রাকৃতিক ঘটনা মাত্র, কিন্তু কবির মনে সেই ফুল রূপ নেয় ভালোবাসা কিংবা ক্ষণস্থায়িত্বের চিরন্তন প্রতীকে। অর্থাৎ, প্রথম স্তরে বস্তুজগৎ মনের কারখানায় রূপান্তরিত হয়ে ব্যক্তিনিষ্ঠ অনুভূতির রূপ নেয়।
### ২. দ্বিতীয় তলা: "মনের উপর বিশ্বমনের কারখানা"
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যদর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো **'বিশ্বমন'** বা সার্বজনীন চেতনার ধারণা। কেবল ব্যক্তিসত্তার 'মন' বা একক অভিজ্ঞতায় সাহিত্য সৃষ্টি সম্পূর্ণ হতে পারে না।
```
[বস্তুজগৎ (বাহ্যিক উদ্দীপনা)]
↓
[ব্যক্তিমন (প্রথম তলা: ব্যক্তিগত অনুভূতি ও কল্পনা)]
↓
[বিশ্বমন (উপর তলা: সার্বজনীন চেতনা ও চিরন্তন রস)]
↓
[সাহিত্য]
```
* **ব্যক্তিমন থেকে বিশ্বমনে উত্তরণ:** কবির ব্যক্তিগত আনন্দ, শোক বা অনুভূতির একটি নিজস্ব সীমা থাকে। কিন্তু সেই অনুভূতি যখন কবির 'ব্যক্তিমন' অতিক্রম করে মানবজাতির চিরন্তন বোধ বা **'বিশ্বমনের কারখানায়'** গিয়ে পৌঁছায়, তখনই তা শিল্পে পরিণত হয়।
* **শোক থেকে শ্লোকে রূপান্তর:** বাল্মীকি রামায়ণের ক্রৌঞ্চবধের ঘটনায় যে শোক অনুভব করেছিলেন, তা যদি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত শোক থাকত, তবে তা কাব্য হয়ে উঠত না। সেই শোক যখন সমগ্র মানবজাতির বিরহ ও যন্ত্রণার সঙ্গে যুক্ত হলো, অর্থাৎ বিশ্বমনের কারখানায় শোধিত হলো—তখনই তা সার্বজনীন কাব্য বা ‘শ্লোক’-এ রূপান্তরিত হলো।
### ৩. "সেই উপর তলা হইতে সাহিত্যের উৎপত্তি"
রবীন্দ্রনাথ এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে একটি বহুতল ভবনের রূপকের সঙ্গে তুলনা করেছেন:
1. **ভিত্তিতল (একতলা):** রূপ-রস-শব্দে ভরা বস্তুবিশ্ব বা প্রত্যক্ষ বাস্তবতা।
2. **দ্বিতীয় তলা:** ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ 'ব্যক্তিমন'।
3. **উপর তলা (তৃতীয় তলা):** ব্যক্তিস্বার্থমুক্ত, চিরন্তন ও সর্বজনীন 'বিশ্বমন'।
রবীন্দ্রনাথের মতে, খাঁটি সাহিত্য দ্বিতীয় তলা থেকে উৎপন্ন হয় না, তা উৎপন্ন হয় এই **"উপর তলা"** বা বিশ্বমনের কারখানা থেকে। কবির ব্যক্তিগত 'আমি' যখন সর্বজনীন 'আমির' সঙ্গে মিলে যায়, তখনই সৃষ্টি হয় সাহিত্য। এই স্তরে পৌঁছালে সাহিত্যিক আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কালের থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকালের রূপকার।
### উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সাহিত্য কোনো কৃত্রিম রূপনির্মাণ নয়—তা এক গভীর আত্মিক ও মানসিক রসায়নের ফল। বাইরের জগৎ মনকে উদ্দীপিত করে, আর মন বিশ্বমনের কারখানায় সেই উদ্দীপনাকে সার্বজনীন রসে পরিণত করে প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যটিতে কেবল সাহিত্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি, বরং বাস্তব থেকে রসানুভূতির জগতে পৌঁছানোর যে মনস্তাত্ত্বিক সিঁড়ি—তারও এক অপূর্ব দার্শনিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। তাই পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির নিরিখে বাংলা সাহিত্যের নান্দনিক বিচারে এই মন্তব্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও কালজয়ী।
Comments
Post a Comment