অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।
অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।
অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়
আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-
•রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
•'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্বংস হয়। কলকাতায় ইংরেজদের দালালি, মুৎসুদ্দিগিরি ও ঠিকাদারি করে এক শ্রেণীর মানুষ রাতারাতি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে ওঠে। এরা ইতিহাসে 'হঠাৎ-বাবু' নামে পরিচিত।
•সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ঃ এই নব্য-ধনী বাবুদের কোনো উচ্চশিক্ষা বা পরিশীলিত রুচি ছিল না। তাঁদের অর্থানুকূল্যে বিদ্যাচর্চার পরিবর্তে মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি, ঘুড়ি ওড়ানো, বুলবুলির লড়াই এবং সস্তা চটুল আমোদ-প্রমোদের জোয়ার আসে।
•সাহিত্যে প্রতিফলনঃ মঙ্গলকাব্য বা বৈষ্ণব পদাবলীর মতো উচ্চাঙ্গ দেবমহিমা ছেড়ে সাহিত্য নেমে আসে কলকাতার গলিতে, সাধারণ মানুষের চটুল মনোরঞ্জনের স্তরে। ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় এই যুগের মানসিকতা চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে।
•টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও বৈশিষ্ট্য
এই সামাজিক অবক্ষয় ও ডামাডোলের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কিছু নাগরিক লোকসঙ্গীত। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি ধারা হলো টপ্পাও আখড়াই।
ক) টপ্পা গানঃ 'টপ্পা' শব্দের মূল অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষেপে অতিক্রম করা'। এটি মূলত পাঞ্জাবের উটের চালকদের গান ছিল। শোর মিঞা নামক এক শিল্পী একে শাস্ত্রীয় রূপ দেন। কিন্তু বাংলায় এই গানকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেন রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু (১৭৪১-১৮৩৯ খ্রি.)।
•বৈশিষ্ট্যঃ নিধুবাবুর হাত ধরে টপ্পা গান থেকে রাধাকৃষ্ণের ধর্মীয় আবরণী খসে পড়ে এবং তা খাঁটি লৌকিক, মানব-মানবীর পরকীয়া ও স্বকীয় প্রেমের গানে রূপান্তরিত হয়। এর ভাষা ছিল সরল এবং সুর ছিল অত্যন্ত চপল ও তানপ্রধান।
খ) আখড়াই গানঃ 'আখড়া' বা গানের দল থেকে 'আখড়াই' শব্দের উৎপত্তি। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে শান্তিপুরের কবি রামনিধি চূড়ামণি এই গানের প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে কুলুইচন্দ্র সেন এবং নিধুবাবু একে কলকাতায় জনপ্রিয় করে তোলেন।
•বৈশিষ্ট্যঃ আখড়াই গান ছিল অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ঘরানার। এতে ভবানীবিষয়ক (দুর্গাপূজা কেন্দ্রিক), সখীসংবাদ এবং বিরহ—এই তিনটি প্রধান অংশ থাকত। এই গানে বিশাল অর্কেস্ট্রা বা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হতো এবং এটি মূলত প্রতিযোগিতামূলক আসরে গাওয়া হতো। পরবর্তীতে এই আখড়াই গানই লোকরুচির পরিবর্তনে আরও কিছুটা চটুল হয়ে 'হাফ-আখড়াই'-তে রূপ নেয়।
টপ্পা ও আখড়াই গানের জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণ
কলকাতার নাগরিক সমাজে এই গানগুলি অত্যন্ত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক কারণ ছিল।আর সেই কারণগুলি হলো-
•ধর্মনিরপেক্ষ বিনোদনের চাহিদাঃ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল সম্পূর্ণ দেবনির্ভর (যেমন: মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল)। কিন্তু অবক্ষয় যুগের নাগরিক মানুষ কেবল দেবমাহাত্ম্য শুনে তৃপ্ত হতে পারছিল না। তাদের দরকার ছিল নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের কথা। নিধুবাবুর টপ্পা গান রাধাকৃষ্ণের নাম বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের রক্ত-মাংসের প্রেমের কথা বলেছিল, যা তৎকালীন সমাজকে আকর্ষণ করে।
•বাবু শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতাঃ শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মতো কলকাতার ধনী বাবুরা তাঁদের পূজাপার্বণ এবং জলসাঘরের আমোদ-প্রমোদের জন্য নতুন ধরনের সুর খুঁজছিলেন। আখড়াই গানের পেছনে এই বাবুদের বিপুল অর্থসাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, যা এই গানকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়।
•প্রতিযোগিতার আকর্ষণঃ আখড়াই এবং পরবর্তীতে হাফ-আখড়াই গান ছিল মূলত দুটি দলের লড়াই। আসরে এক দল গান বাঁধত, অন্য দল তাৎক্ষণিকভাবে তার পাল্টা জবাব দিত। এই 'লড়াই' বা 'দ্বৈরথ' দেখার জন্য সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও কৌতুহল তৈরি হতো, যা আজকালের রিয়্যালিটি শোর মতো জনপ্রিয় ছিল।
•স্বদেশী ও লৌকিক ভাষার টানঃ নিধুবাবুর টপ্পা গানে প্রথম অত্যন্ত জোরালোভাবে মাতৃভাষার প্রতি টান প্রকাশ পায়। তিনি লিখেছিলেন-
"নানা দেশে নানা ভাষা / বিনে স্বদেশীয় ভাষা, মেটে কি আশা?"
তৎকালীন ইংরেজি-শিক্ষার প্রাথমিক যুগে এই দেশী ভাষার সুর বাঙালির মনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, অবক্ষয় যুগের এই গানগুলির সামাজিক ফলশ্রুতি ছিল মিশ্র।তবে একদিকে, আখড়াই বা খেউড় গানের তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক সময় সুস্থ রুচির সীমা লঙ্ঘন করে কুরুচিকর ও অশ্লীল ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নিত, যা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে, এর একটি ঐতিহাসিক ইতিবাচক দিকও ছিল। এই গানগুলির মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্য প্রথম অলৌকিক জগত থেকে মর্ত্যের মানুষের বাস্তব জগতে পা রাখে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও লৌকিক প্রেমের এই সুরই পরবর্তীকালে উনিশ শতকের 'বাংলার নবজাগরণ' এবং আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার পথ প্রশস্ত করেছিল।
Comments
Post a Comment