স্ত্রীরপত্র।মৃণাল চরিত্রটির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নারীর প্রতিবাদী সত্তাকে কিভাবে তুলে ধরেছেন তা আলোচনা করো। রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়।
স্ত্রীরপত্র।মৃণাল চরিত্রটির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নারীর প্রতিবাদী সত্তাকে কিভাবে তুলে ধরেছেন তা আলোচনা করো। রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘স্ত্রীর পত্র’ (১৯১৪)-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নাম আসলে ‘মৃণাল’ (অনেক সময় আলোচনায় বা অসাবধানতাবশত একে ‘মৃণালিনী’ বলা হয়ে থাকে)। তৎকালীন চরম পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবদমিত সত্তা এবং তার তীব্র প্রতিবাদের এক কালজয়ী দলিল এই মৃণাল চরিত্রটি।
জগন্নাথের তীর্থক্ষেত্র পুরী (শ্রীক্ষেত্র) থেকে কলকাতার ‘মাখনলাল ব্রজলাল অ্যান্ড কোং’-এর মেজোবাবু অর্থাৎ নিজের স্বামীকে লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে মৃণাল সমাজের সমস্ত অন্যায় ও নারী নিগ্রহের বিরুদ্ধে নিজের কণ্ঠস্বরকে সঘোষিত করেছে।মৃণাল চরিত্রটির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নারীর প্রতিবাদী সত্তাকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা নিচে কয়েকটি প্রধান বিন্দুর আলোকে আলোচনা করা হলো-
•মেজোবউ(মৃণাল)পরিচয়ের গণ্ডি ও দাসত্ব প্রত্যাখ্যান।তৎকালীন সমাজে বিয়ের পর একটি মেয়ের নিজস্ব নাম ও পরিচয় হারিয়ে যেত। সে হয়ে উঠত কোনো পরিবারের ‘বউ’ মাত্র। মৃণাল পনেরো বছর ধরে সেই জোড়াসাঁকোর (বা কলকাতার) বড় ঘরের ‘মেজোবউ’ হয়েই কাটিয়েছিল। কিন্তু চিঠির শুরুতেই সে চেনা ছক ভেঙে ঘোষণা করে-
"এ তোমাদের মেজোবউয়ের চিঠি নয়।"
আসলে সে বুঝিয়ে দেয় যে, সে কোনো পরিবারের সম্পত্তি বা দাসী নয়, বরং তার একটি স্বতন্ত্র ‘মানুষ’ হিসেবে অস্তিত্ব রয়েছে। এই আত্মোপলব্ধিই ছিল তৎকালীন সমাজে নারীর প্রথম এবং প্রধান প্রতিবাদ।
•বুদ্ধিমত্তা ও সৃষ্টিশীলতার অধিকার রক্ষাপুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর বুদ্ধিকে ভালো চোখে দেখা হতো না, বরং তা ‘আপদ’ হিসেবে গণ্য হতো। মৃণাল ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং সে গোপনে কবিতা লিখত।শ্বশুরবাড়ির লোক তার এই বুদ্ধিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও মৃণাল তার ভেতরের কবিসত্তাকে মরতে দেয়নি।সমাজের বেঁধে দেওয়া রান্নাবান্না আর গৃহস্থালির কাজের বাইরেও যে নারীর একটি নিজস্ব মননশীল জগৎ থাকতে পারে, লুকিয়ে কবিতা লেখার মাধ্যমে মৃণাল সেই অধিকারেরই প্রতিবাদী উদযাপন করেছে।
•মাতৃত্বের অবমাননা ও সমাজের ক্রুরতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ।আঁতুড়ঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মৃণালের প্রথম কন্যাসন্তানটি জন্মের পরেই মারা যায়। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় কন্যা ভ্রূণ বা নবজাতিকার প্রতি অবহেলা এবং নারীর মাতৃত্বকে কেবল সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে দেখার যে নিষ্ঠুর মানসিকতা, তার বিরুদ্ধে মৃণাল সোচ্চার হয়েছে। সে অত্যন্ত যন্ত্রণার সাথে লিখেছে যে, সে মা হওয়ার দুঃখটুকু পেলেও সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার আনন্দ বা মুক্তিটুকু পায়নি।
•‘বিন্দু’র ট্র্যাজেডি এবং পুরুষতন্ত্রের ভণ্ডামির প্রতিবাদ।গল্পে মৃণালের প্রতিবাদী সত্তা পূর্ণতা পায় আশ্রিতা ও অনাতীয়া মেয়ে ‘বিন্দু’র লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।বিন্দুর ওপর যখন তার পরিবার মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিল, তখন একমাত্র মৃণালই তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল।সমাজের লোক যখন লোকলজ্জার ভয়ে বিন্দুর বিয়ে এক উন্মাদ বা পাগলের সাথে ঠিক করে, এবং বিন্দুর দিদি নিজে বলে—
"পাগল হোক, ছাগল হোক, স্বামীতো বটে!"
তখন মৃণাল এই অন্ধ ও কুৎসিত সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সে বিন্দুকে রক্ষা করার জন্য নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছিল।
•চূড়ান্ত মুক্তি ও গৃহত্যাগ (খাঁচা ভাঙার গান)।বিন্দুর আত্মহত্যার ঘটনাটি মৃণালের চোখ পুরোপুরি খুলে দেয়। সে বুঝতে পারে, এই চার দেয়ালের সংসারে থাকলে তাকেও একদিন বিন্দুর মতোই তিলে তিলে মরতে হবে বা নিজের মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিতে হবে। তাই সে আর সেই পরাধীন সংসারে ফিরে না যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। চিঠির শেষে সে লেখে-
"আর আমি ফিরব না তোমাদের সাত নম্বর মাকড়সার জালে।"
সে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করে জগন্নাথের সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে। এই গৃহত্যাগ কোনো পলায়নবৃত্তি ছিল না, এটি ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখে এক সজোরে চপেটাঘাত এবং নারীর স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারের চূড়ান্ত জয়ঘোষণা।
সবশেষে আমাদের বলতেই হয় যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃণাল চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজকে দেখিয়েছিলেন যে, ঘরের কোণে অবদমিত করে রাখা নারী কেবলই চোখের জল ফেলার পাত্রী নয়। তার ভেতরেও আত্মসম্মানবোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে। বিন্দুর মৃত্যুর আগুনে পুড়ে মৃণালের ভেতরের যে রূপান্তর ঘটেছিল, তা তৎকালীন সমাজের তথাকথিত ‘আদর্শ সনাতনী নারী’র ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে এক আধুনিক, স্বাধীনচেতা ও প্রতিবাদী নারী সত্তার জন্ম দিয়েছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH SIR
Comments
Post a Comment