Skip to main content

 বি.এ. বাংলা অনার্স (মেজর) চতুর্থ সেমিস্টারের ১০ নম্বরের প্রশ্নের উপযোগী নিখুঁত দৈর্ঘ্য ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ উত্তর নিচে দেওয়া হলো (এটি ৫-৬ পৃষ্ঠার নোট বা পরীক্ষার খাতার ২.৫ থেকে ৩ পাতার জন্য উপযুক্ত):

## "সৌন্দর্যই সাহিত্যের চরম লক্ষ্য।"— 'সাহিত্য ও সৌন্দর্য' এবং 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য' প্রবন্ধ দুটির প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যতত্ত্ব ও সাহিত্যের উদ্দেশ্য আলোচনা করো।

### ভূমিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ স্রষ্টা নন, তিনি এক মহান রসবেত্তা ও নন্দনতাত্ত্বিক। তাঁর 'সাহিত্য' গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত **‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’** (১২৯৬ বঙ্গাব্দ) এবং **‘সাহিত্য ও সৌন্দর্য’** প্রবন্ধ দুটি বাংলা সাহিত্যচিন্তার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সাহিত্যের নানান উপযোগিতা বা উদ্দেশ্য থাকতে পারে—যেমন নীতিশিক্ষা দেওয়া, ইতিহাস রক্ষা করা কিংবা সমাজ সংস্কার করা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নান্দনিকতার সমন্বয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সাহিত্য কোনো কাজের জিনিস নয়, সাহিত্য হলো আনন্দের প্রকাশ এবং **"সৌন্দর্যই সাহিত্যের চরম লক্ষ্য।"**

### ১. ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’: প্রয়োজনহীনতা ও আনন্দের তত্ত্ব

‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত প্রচলিত উপযোগিতাবাদী (Utilitarian) ধারণাকে সম্পূর্ণ খণ্ডন করেছেন:

 * **প্রয়োজনহীনতার মহিমা:** সংসারী মানুষ সবকিছুর মধ্যেই একটি লৌকিক ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘উপযোগিতা’ খোঁজে। কিন্তু বিশুদ্ধ সাহিত্যের কোনো বাহ্যিক প্রয়োজন থাকে না। নদী যেমন কেবল মানুষের জল ফুটিয়ে বাষ্প করার মতো সংকীর্ণ কাজের জন্য তৈরি হয়নি—তার আসল কাজ বয়ে চলা ও প্রকৃতিকে সুন্দর করা; সাহিত্যও ঠিক তেমনই কোনো বৈষয়িক কাজের দাস নয়।

 * **মানুষের উদ্বৃত্ত আবেগ (Surplus in Man):** জীব হিসেবে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রয়োজন মেটালেই চলে। কিন্তু এই জাগতিক প্রয়োজন মেটার পরও মানুষের মনে এক বিরাট অতিরিক্ত আবেগ ও অনুভূতি থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথ একে বলেছেন মানুষের "উদ্বৃত্ত" (Surplus)। এই উদ্বৃত্ত আবেগ যখন উপচে পড়ে, তখনই সাহিত্য ও শিল্পকলার জন্ম হয়।

 * **আনন্দই আদি ও অন্ত:** সাহিত্য হলো হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের অহেতুক সংযোগ। কবি তাঁর ভেতরের আনন্দকে রূপ দেন, আর পাঠক তা আস্বাদন করে আনন্দ পান। এই অনাবিল আনন্দ সৃষ্টি ও আস্বাদন করাই সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য।

### ২. ‘সাহিত্য ও সৌন্দর্য’: রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যতত্ত্বের স্বরূপ

‘সাহিত্য ও সৌন্দর্য’ প্রবন্ধে কবিগুরু সৌন্দর্যকে সাহিত্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে স্থাপন করেছেন। তাঁর সৌন্দর্যতত্ত্বের প্রধান দিকগুলি হলো:

 * **সত্য ও সৌন্দর্যের অভেদত্ব:** রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যভাবনা উপনিষদের *‘সত্যং শিবং সুন্দরম্’* দর্শনে প্রতিষ্ঠিত। জগতে যা সত্য, তা যখন আমাদের বুদ্ধি বা যুক্তিকে অতিক্রম করে হৃদয়কে স্পর্শ করে, তখনই তা আমাদের কাছে ‘সুন্দর’ হয়ে ওঠে। সাহিত্যিক সেই সত্য ও সুন্দরের মেলবন্ধন ঘটান।

 * **হৃদয়ের রসে শোধন:** আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা রূপ-রস-গন্ধময় বস্তুজগৎ নিজে থেকে সাহিত্য তৈরি করে না। বস্তু যখন কবির অনুভূতির আগুনে গলে মনের রসে শোধিত হয়, তখন তা এক নতুন নান্দনিক রূপ (Beauty) লাভ করে।

 * **কুৎসিত ও দুঃখের সৌন্দর্য রূপান্তর:** বাস্তবে যা অসুন্দর, কুৎসিত বা অত্যন্ত দুঃখের—সাহিত্যের ছোঁয়ায় তা-ই সৌন্দর্যে পরিণত হয়। যেমন—বাস্তব জীবনে মৃত্যু বা বিরহ বেদনাদায়ক, কিন্তু কাব্যে বা নাটকে সেই বিরহই পরম নান্দনিক সৌন্দর্যে পরিণত হয়। 'রামায়ণ'-এ ক্রৌঞ্চবধের শোক যেমন শ্লোকে অর্থাৎ সৌন্দর্যে রূপান্তরিত হয়েছিল।

### ৩. রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সাহিত্যের লক্ষ্য ও নীতিশিক্ষার সম্পর্ক

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকে সমাজকল্যাণ বা নীতির বিরুদ্ধে দাঁড় করাননি, কিন্তু নীতি শিক্ষাকে সাহিত্যের মূল কাজ বলতে নারাজ ছিলেন।


| তুলনা | প্রচারমুখী বা নীতিশিক্ষামূলক রচনা | সৌন্দর্যকেন্দ্রিক সাহিত্য (রবীন্দ্রনাথের মত) |

| :--- | :--- | :--- |

| **মূল উদ্দেশ্য** | নির্দিষ্ট কোনো জ্ঞান, নীতি বা তত্ত্ব প্রচার করা। | নিরাসক্ত আনন্দ দেওয়া ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করা। |

| **প্রভাবের পদ্ধতি** | মানুষকে আদেশ করে বা উপদেশ দেয়। | মানুষের মনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মার্জিত ও সুন্দর করে। |

| **আবেদনের স্থায়িত্ব** | সাময়িক ও উদ্দেশ্য হাসিল হলেই গুরুত্ব হারায়। | সার্বজনীন ও কালজয়ী (আবেদন চিরন্তন)। |


রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্য যদি নীতি উপদেশ দিতে যায়, তবে তা তার স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে পাঠশালা বা প্রচারপত্রে পরিণত হয়। কিন্তু সাহিত্য যখন সততার সঙ্গে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে, তখন তা পাঠকের হৃদয়কে এতই বিশাল ও সংবেদনশীল করে তোলে যে মানুষ আপনা থেকেই ভালো ও সুন্দরের দিকে ধাবিত হয়।

### ৪. সৌন্দর্যতত্ত্ব ও পরমাত্মার যোগ

রবীন্দ্রনাথের নন্দনতত্ত্ব কেবল পার্থিব রূপের বর্ণনায় থেমে থাকে না। তাঁর মতে, সাহিত্যের সৌন্দর্য মানুষকে সংকীর্ণ 'আমি' বা স্বার্থপরতার গণ্ডি থেকে মুক্ত করে। সাহিত্যপাঠের মাধ্যমে মানুষ যখন সুন্দরের আস্বাদন পায়, তখন সে নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব ভুলে বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবজাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। সুন্দরের এই আনন্দ আসলে অসীমের আনন্দ—যা মানুষকে জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি দেয়।

### উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে সাহিত্য কোনো উদ্দেশ্যসাধনের যন্ত্র বা কাজের দাস নয়। বাইরের বাস্তব জগতকে যখন মানুষের হৃদয় নিজের ভালোলাগা ও ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করে, তখন সেই হৃদয়ের অনুভবই নান্দনিক রূপ পেয়ে সাহিত্যে রূপায়িত হয়। নীতিশিক্ষা বা ইতিহাস রক্ষা সাহিত্যের আনুসঙ্গিক ফল হতে পারে, কিন্তু তার মূল প্রাণশক্তি লুকিয়ে থাকে সুন্দরের মধ্যে। তাই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভাবনার নির্যাস টেনে বলা যায়—**বাস্তবকে রসে রূপায়িত করা, সত্যকে সুন্দর করা এবং সৌন্দর্য সৃষ্টির মাধ্যমে চিরন্তন আনন্দ পরিবেশন করাই সাহিত্যের চরম ও পরম লক্ষ্য।**

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...