Skip to main content

প্রচ্ছন্ন স্বদেশ।  'প্রচ্ছন্ন স্বদেশ' কবিতায় কবি বিষ্ণু দে কোন স্বদেশ সত্তার অনুসন্ধান করেছেন? কবিতাটি অবলম্বনে তা ব্যাখ্যা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।




বিষ্ণু দের ‘প্রচ্ছন স্বদেশ’ (আসলে কবিতাটির প্রকৃত নাম **‘প্রচ্ছন্ন স্বদেশ’**) তাঁর আধুনিক কাব্যচেতনার এক অনন্য দলিল। মার্কসীয় দর্শন এবং গভীর মননশীলতায় বিশ্বাসী বিষ্ণু দে এই কবিতায় কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা নিছক রোমান্টিক ভাবালুতায় ঘেরা দেশের সন্ধান করেননি। তাঁর অন্বেষণের 'স্বদেশ' অনেক বেশি গভীর, যা সমকালীন অবক্ষয় ও যন্ত্রণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক শাশ্বত ও প্রকৃত ভারতবর্ষের রূপ।

কবিতাটি অবলম্বনে কবি যে স্বদেশ সত্তার অনুসন্ধান করেছেন, তা নিচে কয়েকটি মূল ভাবধারায় ব্যাখ্যা করা হলো:

## ১. অবক্ষয় ও সংকটের আড়ালে আসল স্বদেশের খোঁজ

কবির সমকালীন সময়টা ছিল যুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগ এবং মন্বন্তরের অভিঘাতে ক্ষতবিক্ষত। চোখের সামনে চেনা সমাজ ও সংস্কৃতির এই পতন কবিকে ব্যথিত করেছিল। কিন্তু কবি বিশ্বাস করতেন, এই যে ভাঙন, অনাহার আর হাহাকার— এটা ভারতের আসল রূপ বা আসল সত্তা নয়। এটি ক্ষণস্থায়ী। এর আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ‘প্রচ্ছন্ন’ বা গোপন স্বদেশ, যা তার আদিম শক্তি ও ঐতিহ্য নিয়ে আজও বেঁচে আছে। কবি সেই ভেতরের শক্তিমান স্বদেশ সত্তাকেই খুঁজে বের করতে চেয়েছেন।

## ২. শ্রমজীবী মানুষের লড়াকু সত্তা

বিষ্ণু দে ছিলেন প্রগতিশীল চেতনার কবি। তাই তাঁর স্বদেশের খোঁজ কোনো রাজকীয় ইতিহাস বা উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমে শেষ হয় না। তাঁর স্বদেশ সত্তা মিশে আছে এদেশের মাটির সাথে, মাঠের চাষী, কারখানার শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের সংগ্রামী জীবনের সাথে। শত অত্যাচার ও শোষণের পরেও যে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ বুক চিতিয়ে লড়াই করে এবং জীবনকে সচল রাখে, কবি তাঁদের মধ্যেই স্বদেশের প্রকৃত প্রাণস্পন্দন বা সত্তা খুঁজে পেয়েছেন।

## ৩. ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

কবির অন্বেষিত স্বদেশ সত্তাটি একদিকে যেমন ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য, পুরাণ ও লোকসংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত, অন্যদিকে তা আধুনিক আন্তর্জাতিক চেতনায় সমৃদ্ধ। তিনি এমন এক স্বদেশের স্বপ্ন দেখেছেন যা নিজের শিকড়কে ভুলবে না, আবার আধুনিক যুগের প্রগতিশীল চিন্তাভাবনাকেও আপন করে নেবে। অতীত ও বর্তমানের এই মেলবন্ধনেই গড়ে ওঠে কবির স্বপ্নের প্রচ্ছন্ন স্বদেশ।

## ৪. আত্মিক মুক্তি ও আশাবাদ

বিষ্ণু দের কাছে স্বদেশ কোনো জড় বস্তু বা মানচিত্র নয়, তা এক জীবন্ত আত্মিক অনুভূতি। চারিদিকের হতাশার মধ্যেও কবি এক গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সাময়িক জড়তা ও পরাধীনতার মানসিকতা কাটিয়ে এদেশের মানুষ একদিন জেগে উঠবেই। শৃঙ্খলমুক্ত, শোষণহীন এবং চেতনায় উন্নত যে ভারতবর্ষের রূপ কবির মনে বাসা বেঁধেছিল, তা-ই তাঁর অন্বেষণের মূল লক্ষ্য।

> **সংক্ষেপে বলতে গেলে:**

> ‘প্রচ্ছন্ন স্বদেশ’ কবিতায় বিষ্ণু দে বাইরের জরাজীর্ণ, ক্ষতবিক্ষত এবং অবক্ষয়িত বাস্তবতার খোলসটি ছাড়িয়ে ভেতরের এক অপরাজেয়, প্রগতিশীল এবং শ্রমজীবী মানুষের ভারতবর্ষকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। এই প্রচ্ছন্ন বা লুকিয়ে থাকা অন্তর্নিহিত শক্তিই কবির চোখে প্রকৃত স্বদেশ সত্তা, যা সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে একদিন আলোয় আসবেই।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...