ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ শ্রেণির তার ইতিহাস মাইনর।
১. সাঁ-কুল্যৎ (Sans-culottes) কাদের বলা হয়?
•ফরাসি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের দরিদ্র শ্রমজীবী, কারিগর, দোকানদার ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের 'সাঁ-কুল্যৎ'বলা হতো।
২. ফিজিওক্রাট (Physiocrats) কারা ছিলেন?
•অষ্টাদশ শতকে ফরাসি বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে একদল অর্থনীতিবিদদের আবির্ভাব ঘটে, যারা ফিজিওক্রাট বা 'প্রকৃতিবাদী' নামে পরিচিত ছিলেন। ফ্রাঁসোয়া কুয়েসনে ছিলেন এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা।
৩. ক্রিমিয়ার যুদ্ধের (১৮৫৩–১৮৫৬) কারণগুলো আলোচনা করো।
১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত রাশিয়া এবং ওসমানের সাম্রাজ্য (তুরস্ক)-এর মধ্যে এই যুদ্ধ হয়, যেখানে তুরস্কের পক্ষে যোগ দেয় ব্রিটেন ও ফ্রান্স। যুদ্ধের প্রধান কারণগুলো ছিল:
•পবিত্র স্থানসমূহের বিতর্কঃজেরুজালেমের খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার নিয়ে ফ্রান্সের ক্যাথলিক এবং রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
•রুশ সাম্রাজ্যবাদ ও তুরস্কের দুর্বলতাঃ অটোমান বা তুর্কি সাম্রাজ্য তখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল (যাকে 'ইউরোপের রুগ্ন মানুষ' বলা হতো)। রাশিয়া এই সুযোগে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নিজের প্রভাব বাড়াতে এবং ভূমধ্যসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেতে তুরস্ককে আক্রমণ করে।
•ব্রিটেন ও ফ্রান্সের স্বার্থঃব্রিটেন ও ফ্রান্স আশঙ্কা করেছিল যে রাশিয়া যদি তুরস্ক দখল করে নেয়, তবে এশিয়ায় তাদের বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য (বিশেষ করে ব্রিটিশ ভারতের নিরাপত্তা) বিপন্ন হবে। তাই তারা রাশিয়ার অগ্রযাত্রা রুখতে তুরস্কের পাশে দাঁড়ায়।
৪. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ফ্যাসিবাদ উত্থানের কারণ কী ছিল?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। এর প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো-
•ভার্সাই চুক্তির অসন্তোষঃপ্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি বিজয়ী পক্ষে থাকলেও প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে বা ভার্সাই চুক্তিতে তারা আশানুরূপ কোনো অঞ্চল বা সুবিধা পায়নি। এই জাতীয় অপমান ইতালির মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
•অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বেকারত্বঃযুদ্ধের পর ইতালিতে চরম মুদ্রাস্ফীতি, কলকারখানা বন্ধ এবং ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ তৎকালীন গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।
• সাম্যবাদের ভয়ঃ রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতালির ধনী, শিল্পপতি ও জমিদার শ্রেণী ভয় পেয়েছিল যে দেশে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম চলে আসতে পারে। মুসোলিনি নিজেকে সাম্যবাদের ঘোর বিরোধী হিসেবে তুলে ধরায় তারা তাকে অর্থ ও সমর্থন দেয়।
• মুসোলিনির ব্যক্তিত্ব ও প্রচারঃ বেনিতো মুসোলিনি তার উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তৃতা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ দল 'ব্ল্যাক শার্টস' (Black Shirts)-এর মাধ্যমে জনগণকে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ইতালির স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন।
৫. ফরাসি বিপ্লবের প্রকৃতিতে সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রভাব ও পরিণতি আলোচনা করো।
১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে জ্যাকোবিন নেতা রোবসপিয়ারের নেতৃত্বে যে চরমপন্থী শাসন চলেছিল, তা সন্ত্রাসের রাজত্ব নামে পরিচিত।যার প্রভাব-
•অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শক্ত হাতে দমনঃ বিপ্লব-বিরোধী যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে 'গিলোটিন' নামক যন্ত্রে শিরচ্ছেদ করা হতো। রানী মেরি আঁতোয়ানেত থেকে শুরু করে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও বিপ্লবী নেতাকে হত্যা করা হয়।
•বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধঃসন্ত্রাসের জেরে দেশে এক ধরণের কঠোর শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, যা ফ্রান্সকে চারপাশের রাজতন্ত্রবাদী দেশগুলোর সম্মিলিত আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। যার পরিণতি-
•রোবসপিয়ারের পতনঃ সন্ত্রাসের অতিশয্যে সাধারণ মানুষ ও খোদ জ্যাকোবিন দলের নেতারাই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। অবশেষে ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে রোবসপিয়ারকে বন্দি করে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যার ফলে সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।
•মধ্যপন্থী বুর্জোয়াদের উত্থানঃ জ্যাকোবিনদের পতনের পর ফ্রান্সে আবার নরমপন্থী বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্তদের শাসন (ডাইরেক্টরি শাসন) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
৬. বাস্তিল দুর্গের পতন কবে হয়েছিল? এর গুরুত্ব আলোচনা করো।।
•১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই প্যারিসের উত্তেজিত জনতা বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটিয়েছিল।
•স্বৈরাচারের পতনের প্রতীকঃ বাস্তিল দুর্গ ছিল ফরাসি রাজতন্ত্রের অত্যাচার, স্বৈরাচার এবং অন্যায়ের প্রতীক। এর পতন প্রমাণ করে যে জনগণের শক্তির সামনে রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতাও অসহায়।
•বিপ্লবের গতি বৃদ্ধিঃএই ঘটনার পর ফরাসি বিপ্লব প্যারিসের গণ্ডি পেরিয়ে সারা ফ্রান্সের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকেরা সামন্তপ্রভুদের ওপর আক্রমণ শুরু করে।
•জাতীয় দিবসঃএই দিনটিকে ফরাসি বিপ্লবের প্রকৃত সূচনা ধরা হয়। আজও ১৪ই জুলাই দিনটি ফ্রান্সের 'জাতীয় দিবস' (Bastille Day) হিসেবে মহাসড়ম্বরে উদযাপিত হয়।
Comments
Post a Comment