Skip to main content

কাব্যের ভাষা।। "কাব্যের ভাষা বাচ্যার্থের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যঞ্জনার জগতে প্রবেশ করে।"—অতুলচন্দ্র গুপ্তের আলোচনা অনুসরণে কাব্যভাষায় ব্যঞ্জনার স্বরূপ এবং সাধারণ ব্যবহারের ভাষার সঙ্গে তার পার্থক্য উদাহরণসহ আলোচনা করো।

কাব্যের ভাষা।। "কাব্যের ভাষা বাচ্যার্থের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যঞ্জনার জগতে প্রবেশ করে।"—অতুলচন্দ্র গুপ্তের আলোচনা অনুসরণে কাব্যভাষায় ব্যঞ্জনার স্বরূপ এবং সাধারণ ব্যবহারের ভাষার সঙ্গে তার পার্থক্য উদাহরণসহ আলোচনা করো।

         প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক অতুলচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ‘কাব্যজিজ্ঞাসা’ গ্রন্থে অলঙ্কারশাস্ত্রের আলোকেই কাব্যভাষার আসল চরিত্র উন্মোচন করেছেন। তাঁর মতে, কাব্যভাষা সাধারণ কথ্য বা তথ্যজ্ঞাপক ভাষার মতো কেবল অভিধাননির্ভর সোজা কথা বলে না। কাব্যের মূল আবেদন লুকিয়ে থাকে শব্দের বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে ব্যঙ্গার্থ বা ব্যঞ্জনায়। তাই অতুলচন্দ্র গুপ্তের তাত্ত্বিক অবস্থান— “কাব্যের ভাষা বাচ্যার্থের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যঞ্জনার জগতে প্রবেশ করে।”

      •কাব্যভাষায় ব্যঞ্জনার স্বরূপ।শব্দের তিনটি শক্তি থাকে-অভিধা(বাচ্যার্থ),লক্ষণা (লক্ষ্যার্থ) এবং ব্যঞ্জনা (ব্যঙ্গার্থ/ধ্বনি)। আর সেখানে-

     বাচ্যার্থের সীমাঃ অভিধা শক্তির সাহায্যে শব্দ যে প্রাথমিক বা অভিধানগত অর্থ প্রকাশ করে, তা-ই বাচ্যার্থ। যেমন: "গাঙ্গে ঘোষঃ" (গঙ্গায় গোপপল্লী)। বাচ্যার্থ কেবল তথ্য দেয়, হৃদয়ে কোনো রস সৃষ্টি করে না।

      •ব্যঞ্জনার জগৎঃ কাব্যভাষায় বাচ্যার্থ হলো কেবল একটি সূচনা বা বাইরের আবরণ। কবি যখন এমন শব্দ ও পঙক্তি ব্যবহার করেন যা অভিধানের সীমানা ছাড়িয়ে পাঠকের হৃদয়ে এক গভীর অনির্বচনীয় অনুভূতি বা নান্দনিক ভাব জাগিয়ে তোলে, তাকেই **ব্যঞ্জনা** বা **ধ্বনি** বলে। আনন্দবর্ধনের ভাষায় এটিই হলো **‘রসধ্বনি’**।

> **উদাহরণ:** জীবনানন্দ দাশের—“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”—এখানে ‘হাজার বছর’ বা ‘পথ হাঁটা’ কোনো ভৌগোলিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়; এর বাচ্যার্থ অতিক্রম করে মানবজীবনের চিরন্তন ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা ও দীর্ঘ যাত্রার এক গভীর **ব্যঞ্জনা** ফুটে উঠেছে।

## **২. সাধারণ ব্যবহারের ভাষা ও কাব্যভাষার পার্থক্য:**

অতুলচন্দ্র গুপ্তের আলোচনা অনুসরণে সাধারণ ব্যবহারিক ভাষা এবং কাব্যভাষার প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:


| বৈশিষ্ট্য | সাধারণ ব্যবহারের ভাষা (Practical Language) | কাব্যভাষা (Poetic Language) |

| :--- | :--- | :--- |

| **১. মূল উদ্দেশ্য** | তথ্য আদান-প্রদান ও বাস্তব যোগাযোগ রক্ষা করা। | পাঠকের হৃদয়ে নান্দনিক রসাস্বাদন ও আনন্দ জাগানো। |

| **২. শব্দের শক্তি** | প্রধানত **অভিধা** (বাচ্যার্থ) নির্ভর। কথা যা বলা হয়, অর্থ তা-ই থাকে। | প্রধানত **ব্যঞ্জনা** (ব্যঙ্গার্থ/ধ্বনি) নির্ভর। বলা কথার পেছনে গভীর অর্থ থাকে। |

| **৩. অর্থগত সীমা** | নির্দিষ্ট, সীমাবদ্ধ ও বস্তুনিষ্ঠ (Objective)। সংজ্ঞায়িত ও স্পষ্ট। | অসীম, বহু অর্থবহ ও আত্মনিষ্ঠ (Subjective)। পাঠকভেদে এর অনুভূতির বিস্তার ঘটে। |

| **৪. হৃদয়ের প্রতিক্রিয়া** | বুদ্ধিকে জাগায়, তথ্য দেয়; কিন্তু হৃদয়ে আবেগ বা রস সৃষ্টি করে না। | পাঠকের কল্পনাশক্তিতে নাড়া দেয় এবং সুপ্ত 'স্থায়ী ভাব'কে রসে রূপান্তর করে। |


## **৩. উদাহরণসহ তুলনামূলক বিশ্লেষণ:**

একটি সাধারণ দৃশ্যকে দুটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করলে এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়:

 * **সাধারণ ব্যবহারের ভাষা:** *"আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে এবং চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে।"*

   **(বিশ্লেষণ):** এটি কেবল আবহাওয়ার একটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দেয় (বাচ্যার্থ)। এতে মনের কোনো আবেগ জাগে না।

 * **কাব্যভাষা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর):**

   > *"শ্রাবণের গগনের উদাসীন মেঘের মতন / আমি ফিরি হেসে হেসে..."*

   > **অথবা,**

   > *"মন কেমন করে ওগো মেঘের জলদ-ঘনে..."*

   > **(বিশ্লেষণ):** এখানে বৃষ্টির তথ্য মুখ্য নয়। ‘উদাসীন মেঘ’ বা ‘মেঘের জলদ-ঘন’ শব্দগুলো বাচ্যার্থের সীমা ছাড়িয়ে বিরহ, উদাসীনতা ও গভীর আকুলতার এক অপূর্ব **ব্যঞ্জনা** তৈরি করে, যা পাঠকের মনে রসের সৃষ্টি করে।

   > 

### **উপসংহার:**

পরিশেষে বলা যায়, সাধারণ ভাষা যেখানে তথ্য বা বিজ্ঞাপনের কাজ করে, কাব্যভাষা সেখানে শিল্পের রূপ নেয়। অতুলচন্দ্র গুপ্ত যথার্থই দেখিয়েছেন যে, কাব্যের প্রাণ হলো রস, আর সেই রস সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার হলো ব্যঞ্জনা। যে ভাষা বাচ্যার্থের গণ্ডিতে আটকে থাকে তা পদ্য হতে পারে, কিন্তু সার্থক কাব্য হতে পারে না। বাচ্যার্থের দেয়াল ভেঙে ব্যঞ্জনার অনন্ত জগতে প্রবেশ করার মাধ্যমেই কাব্যভাষা তার সার্থকতা লাভ করে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...