Skip to main content

চন্দ্রগুপ্ত।চাণক্যের প্রতিহিংসা চন্দ্রগুপ্ত নাটকের কিভাবে দেশপ্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে তা আলোচনা করো।

চন্দ্রগুপ্ত।চাণক্যের প্রতিহিংসা চন্দ্রগুপ্ত নাটকের কিভাবে দেশপ্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে তা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।

        আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ (১৯১১) নাটকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো আচার্য চাণক্যের চরিত্র। চাণক্যের চরিত্রটি একাধারে তীব্র ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা এবং অন্যদিকে এক বিশাল দেশপ্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়। নাটকের শুরুতে যে আগুন জ্বলেছিল ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, নাটকের শেষ পর্বে তা কীভাবে অখণ্ড ভারত গঠনের মহিমান্বিত দেশপ্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে, তা নাট্যকার অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন। আর সেই নাটকে-

     •চাণক্যের প্রতিহিংসার উৎস বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ। চাণক্যের সমস্ত কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক চালিকাশক্তি ছিল রাজসভা থেকে পাওয়া চরম অপমান। মগধের অত্যাচারী রাজা মহপদ্ম নন্দ এবং তার মন্ত্রী রাক্ষস চাণক্যকে রাজসভা থেকে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই চাণক্য প্রতিজ্ঞা করেন-নন্দ বংশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করা পর্যন্ত তিনি তার মাথার শিখা (টিকি) বাঁধবেন না। ঠিক এই পড়বে চাণক্যকে বলতে শুনি-

 "যেদিন এই নন্দ বংশকে সমূলে নির্মূল করতে পারব, সেদিন এই উন্মুক্ত শিখা আবার বন্ধন করব- তার পূর্বে নয়।"

      এই প্রাথমিক পর্বে চাণক্যের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ব্যক্তিগত। তিনি মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে বেছে নিয়েছিলেন কেবল নন্দরাজাকে সিংহাসনচ্যুত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার বা মাধ্যম হিসেবে।

      গ্রিক আক্রমণ ও চাণক্যের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন।নাটকের ঘটনাপ্রবাহে যখন গ্রিক বিজেতা সেকান্দার শাহ (আলেকজান্ডার) ভারত আক্রমণ করেন, তখন চাণক্যের চেতনার পরিধি কেবল মগধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং রাজাদের পারস্পরিক হিংসার সুযোগ নিয়েই বিদেশি শত্রুরা দেশের মাটি দখল করছে। গ্রিক শিবিরের সামরিক শৃঙ্খলা এবং শক্তি দেখে চাণক্যের ভেতরের কূটনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ সত্তা জাগ্রত হয়।

   চাণক্যের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে দেশপ্রেমে রূপান্তর।চন্দ্রগুপ্তের সাহায্যে এবং নিজের ক্ষুরধার কূটনীতি প্রয়োগ করে চাণক্য একে একে তার শত্রুদের পরাস্ত করতে থাকেন। কিন্তু নন্দ বংশের পতন যতই ঘনিয়ে আসে, চাণক্যের মনের ভেতরের ক্ষোভ ততই এক বৃহত্তর লক্ষ্যে রূপান্তরিত হতে থাকে। তিনি বুঝতে পারেন, কেবল নন্দ রাজাকে মারলেই হবে না, ভারতকে রক্ষা করতে হলে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা দরকার। আর সেখানে এই রূপান্তরের মূল পর্যায়গুলো হলো-

         •হাতিয়ার থেকে নায়কের মর্যাদায় চাণক্য প্রথমে চন্দ্রগুপ্তকে কেবল নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ‘হাতিয়ার’ ভাবতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে চন্দ্রগুপ্তের বীরত্ব, উদারতা এবং ভারতমাতার প্রতি ভক্তি দেখে চাণক্য তাকে ভারতের হবু ‘ত্রাতা’ বা সম্রাট হিসেবে মনে-প্রাণে গ্রহণ করেন।

     •ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করেন চাণক্য।নাটকের শেষ দিকে চাণক্যের মধ্যে আর কোনো ব্যক্তিগত লোভ বা অহংকার অবশিষ্ট থাকে না। মগধ জয় করার পর তিনি নিজে সিংহাসনে বসেননি বা কোনো ক্ষমতার লোভ করেননি। তিনি সমস্ত ক্ষমতা চন্দ্রগুপ্তের হাতে তুলে দেন।

       ক্ষমা ও উদারতাময় চাণক্য।প্রতিহিংসাপরায়ণ চাণক্য নাটকের শেষে এসে তার পরম শত্রু মহামন্ত্রী রাক্ষসকে ক্ষমা করে দেন এবং তাকেই মগধের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। এটি প্রমাণ করে যে, নিজের জয় নয়, মগধের ও ভারতের সুশাসনই ছিল তার শেষ লক্ষ্য।

      •অখণ্ড ভারতের স্বপ্নে (চূড়ান্ত পরিণতি) বিভোর চাণক্য।নাটকের অন্তিম পর্বে চাণক্যের মুখে আমরা যে বাণী শুনি, তা কোনো প্রতিহিংসার আগুন নয়, তা হলো এক পরম দেশপ্রেমিকের দেশাত্মবোধ। তিনি চন্দ্রগুপ্তের মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিয়ে যে অখণ্ড ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা প্রকাশ পায় তাঁর কর্মকাণ্ডে। বিদেশি গ্রিক শক্তিকে বিতাড়িত করে এবং দেশের ভেতরের সমস্ত বিচ্ছিন্ন শক্তিকে এক ছাতার তলায় এনে তিনি এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তাঁর মাথার শিখা যখন আবদ্ধ হয়, তখন তা কেবল নন্দ বংশের ধ্বংসের প্রতীক থাকে না, তা হয়ে ওঠে ভারতের স্বাধীনতার ও অখণ্ডতার প্রতীক।

     পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, চাণক্যের চরিত্রটি একটি নদীর মতো- যা সংকীর্ণ পাহাড়ী পথ (ব্যক্তিগত ক্ষোভ) থেকে উৎপন্ন হয়ে শেষ পর্যন্ত এক বিশাল সমুদ্রে (দেশপ্রেম) গিয়ে মিশেছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় চাণক্যের এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন যে-ব্যক্তিগত ভেদাভেদ ভুলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে এক হতে হবে। তাই চাণক্যের প্রতিহিংসার দেশপ্রেমে রূপান্তরই এই নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যমুহূর্ত।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...