Skip to main content

তোতা কাহিনী।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তোতা কাহিনী ছোটগল্পে শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা আলোচনা করো।

তোতা কাহিনী।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তোতা কাহিনী ছোটগল্পে শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।

     রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোতা কাহিনী’(১৯১৮) কেবল একটি রূপক গল্প নয়, এটি তৎকালীন ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সমাজ ব্যবস্থার ওপর এক তীব্র, তীক্ষ্ণ ও কালজয়ী ব্যঙ্গাত্মক আঘাত। আর সেই আঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে এই গল্পটিতে শিক্ষা ও সমাজের যে বাস্তব রূপ ফুটে উঠেছে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

     ত্রুটিপূর্ণ ও যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র।গল্পের মূল উপজীব্য হলো একটি বুনো তোতাপাখিকে খাঁচায় বন্দী করে তাকে "ভদ্র দস্তুর" মতো শিক্ষা দেওয়ার রাজকীয় প্রচেষ্টা। এই রূপকের আড়ালে রবীন্দ্রনাথ মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার কদর্য রূপকে তুলে ধরেছেন।যেখানে 

        পুঁথিগত বিদ্যার জোরপূর্বক প্রয়োগ দৃশ্যমান। আসলে তোতা পাখিটির স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ছিল গান গাওয়া এবং বনে-জঙ্গলে উড়ে বেড়ানো। কিন্তু রাজা এবং তার পণ্ডিতেরা ঠিক করলেন তাকে বইয়ের পাতা মুখস্থ করাতে হবে। বইয়ের পর বই নকল করে পাখির পেটে জোর করে ঢোকানো হতে লাগল। এটি মূলত তৎকালীন মুখস্থ-সর্বস্ব ও পরীক্ষামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে, যা শিক্ষার্থীর অন্তরের বিকাশ ঘটায় না, বরং তাকে যান্ত্রিক বানিয়ে তোলে।

       বিশাল পরিকাঠামো ও অন্তসারশূন্যতা। পাখিটিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি হলো সোনার খাঁচা, নিয়োগ করা হলো লিপিকর, পণ্ডিত এবং পাহারাদার। শিক্ষার মূল লক্ষ্য (শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জন) হারিয়ে গেল জাঁকজমক ও পরিকাঠামোগত আড়ম্বরের নিচে। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, আধুনিক স্কুল-কলেজের বিশাল ভবন আর নিয়মের বেড়াজাল আসলে শিক্ষার্থীর মনকে বন্দী করার একেকটি 'সোনার খাঁচা'।সেই ব্যবস্থার মধ্যে আমরা দেখতে পাই 

         শিক্ষার্থীর স্বাধীনতার হরণ।পাখিটির ডানা কেটে দেওয়া হলো যেন সে উড়তে না পারে। শিক্ষার নামে শিশুর স্বাভাবিক কৌতুহল, আনন্দ এবং স্বাধীনতাকে যেভাবে টুঁটি চিপে হত্যা করা হয়, ডানা কাটার মাধ্যমে কবি সেটাই বুঝিয়েছেন।

       শোষক ও চাটুকার সমাজ ব্যবস্থার চিত্র।তোতা কাহিনীতে শিক্ষার পাশাপাশি তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক সমাজ ব্যবস্থার এক নির্মম সত্য উন্মোচিত হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভূমিকা এখানে নিখুঁতভাবে চিত্রিত। আর সেই ক্ষেত্রে উঠে এসেছে-

     স্বৈরাচারী শাসক ও উদাসীন প্রশাসন। গল্পের 'রাজা' হলেন সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রতীক। তিনি তোতাপাখির ভালো-মন্দ নিজে চোখ মেলে দেখেন না, বরং ভাগিনাদের (আমলাতন্ত্র) ওপর ভরসা করেন। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নতি হলো কি না, তার চেয়ে রাজার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল-শিক্ষার নামে কত বড় আয়োজন চলছে তা প্রদর্শন করা।তবে-

      তোষামোদি ও চাটুকারিতা (ভাগিনাদের চরিত্র)। রাজার ভাগিনারা হলেন দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর প্রতিনিধি। তারা রাজার তোষামোদ করে নিজের পকেট ভরায়। পাখিটি মারা যাওয়ার মুখে অথচ তারা রাজাকে বোঝায়—"শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে।" সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ সব সময়ই শিক্ষার নামে বরাদ্দ অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়।

     সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী সমাজ (পণ্ডিত ও লিপিকর) পণ্ডিত এবং লিপিকরেরা সমাজের সেই বুদ্ধিজীবী দল, যারা ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের আখের গোছায়। তারা পাখিটির প্রাণহীন দেহের দিকে না তাকিয়ে বইয়ের স্তূপ ও খাঁচার জাঁকজমক নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে ব্যস্ত থাকে।আর সেখানে করা হয়-

        নিন্দুকদের কণ্ঠরোধ।সমাজে যখনই কেউ এই যান্ত্রিক শিক্ষা বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গেছে (গল্পের 'নিন্দুক' চরিত্র), তখনই রাজশক্তি বা সমাজপতিরা তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। কানমলা দিয়ে নিন্দুকদের বিদায় করার ঘটনাটি সমাজে মুক্তচিন্তা ও সমালোচনার অধিকার হরণ করার চিরন্তন রূপক।

      গল্পের করুণ পরিণতি ও মূল বার্তা হিসাবে গল্পের শেষে দেখা যায়, অনাহারে, অত্যাচারে এবং পুঁথির কাগজের চাপে পাখিটি মারা যায়। যখন রাজা এসে পাখিটিকে দেখেন, তখন তার পেট থেকে কোনো গান বের হয় না, কেবল শুকনো কাগজের ‘খড়খড়ানি’ শব্দ শোনা যায়। আসলে রবীন্দ্রনাথ এই গল্পের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, যে শিক্ষা মানুষের আত্মাকে মেরে ফেলে, যা কেবল যান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ, তা আসলে শিক্ষার নামে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড।

     পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ‘তোতা কাহিনী’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রূপকধর্মী ছোট গল্প। আর সেই গল্পটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষা তখনই সার্থক হয় যখন তা শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক বৃত্তির বিকাশ ঘটায়। সমাজ ও রাষ্ট্র যখন শিক্ষার বহিরঙ্গ বা কাঠামোকে শিক্ষার্থীর জীবনের চেয়ে বড় করে দেখে, তখন বুনো তোতাপাখির মতোই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সহজ, স্বাভাবিক মেধা ও প্রাণের অপমৃত্যু ঘটে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH SIR 



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...