Skip to main content

অবক্ষয় যুগের কবিগান, টপ্পা ও হাফ-আখড়াই গানের সামাজিক ফলশ্রুতি বা সামাজিক প্রভাব সংক্ষেপে আলোচনা করো। তৎকালীন সমাজে এই গানগুলি কেন প্রশংসিত এবং সমালোচিত হয়েছিল? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার।

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের 'অবক্ষয় যুগ'বা 'যুগসন্ধিক্ষণ'বলা হয়। এই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা (পলাশী যুদ্ধ-পরবর্তী সময়) এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কলকাতা কেন্দ্রিক এক নতুন 'বাবু সংস্কৃতি' এবং নব্য-ধনী শ্রেণীর জন্ম হয়। এই যুগেই লৌকিক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে কবিগান, টপ্পা ও হাফ-আখড়াই গান তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।আসলে-

    তৎকালীন সমাজে এই গানগুলির সামাজিক ফলশ্রুতি এবং প্রশংসিত ও সমালোচিত হওয়ার কারণগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

সামাজিক ফলশ্রুতি বা সামাজিক প্রভাব

 * **গণবিনোদনের প্রসার:** মধ্যযুগের দেব-দেবী নির্ভর মঙ্গলকাব্য বা ভক্তিরসের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই গানগুলি সাধারণ মানুষ ও বাবু শ্রেণী—সবার জন্যই এক ধর্মনিরপেক্ষ, সহজ ও তাৎক্ষণিক বিনোদনের দুয়ার খুলে দেয়।

 * **লৌকিক থেকে নাগরিক সংস্কৃতির রূপান্তর:** গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী তরজা বা কবিগান কলকাতার বাবুদের ছোঁয়ায় এসে নাগরিক রূপ ধারণ করে। ফলে লোকসংস্কৃতি ও নাগরিক সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন ঘটে।

 * **মানবিক প্রেমের প্রকাশ:** বিশেষ করে নিধুবাবুর (রামনিধি গুপ্ত) 'টপ্পা' গানের মাধ্যমে বাংলা গানে প্রথম কোনো ঐশ্বরিক অনুষঙ্গ ছাড়া খাঁটি লৌকিক ও মানবিক প্রেমের আকুতি প্রকাশ পায়।

 * **তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ:** কবিগান ও হাফ-আখড়াই ছিল মূলত দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক 'উক্তি-প্রত্যুক্তির' গান। আসরে বসেই কবিয়ালদের চটজলদি গান ও ছড়া বাঁধার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল ও রসবোধ জাগ্রত করত।

## ২. সমাজে প্রশংসিত হওয়ার কারণ

এই গানগুলি তৎকালীন সমাজমানসে দারুণভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছিল মূলত নিচের কারণগুলোতে:

 * **ঐহিক ও বাস্তব জীবনের প্রতিফলন:** মানুষ দেব-দেবীর কাহিনীর বদলে নিজেদের দৈনন্দিন আনন্দ-বেদনা, বিরহ ও মানবিক অনুভূতির কথা গানে শুনতে পাচ্ছিল, যা তাদের মনকে সরাসরি ছুঁয়ে যেত।

 * **ধনী ও অভিজাতদের পৃষ্ঠপোষকতা:** কলকাতার শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেবের মতো বড় বড় রাজা, জমিদার ও বাবুরা এই গানগুলির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাদের আসরে এই গানগুলি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হতো।

 * **সাংগীতিক উৎকর্ষ ও নতুন তাল:** নিধুবাবুর টপ্পা এবং হাফ-আখড়াই গানগুলিতে উচ্চাঙ্গ বা মার্গ সঙ্গীতের একটা মার্জিত সুরশৈলী ছিল। বাংলা গানের নিজস্ব সুর ও নতুন নতুন তাল (যেমন: আড়া, মধ্যমান) তৈরিতে এই গানগুলির সাঙ্গীতিক অবদান প্রশংসিত হয়েছিল।

## ৩. সমাজে সমালোচিত হওয়ার কারণ

প্রশংসা পেলেও তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ এবং পরবর্তীকালে আধুনিক মনস্ক চিন্তাবিদদের (যেমন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কাছে এই ধারাটি তীব্রভাবে সমালোচিতও হয়:

 * **স্থূলতা ও অশ্লীলতা (খেউড়):** কবিগান ও হাফ-আখড়াইয়ের আসরে প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য কবিয়ালরা অনেক সময় সস্তা কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল শব্দ (যা 'খেউড়' নামে পরিচিত) ব্যবহার করতেন। এটি তৎকালীন রুচিবান সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

 * **সৃজনের মত্ততা, সৃষ্টির শুদ্ধতাহীনতা:** এই গানগুলিতে তাৎক্ষণিক চটক ও জনমনোরঞ্জনের সস্তা প্রয়াস থাকায় এর মধ্যে কোনো স্থায়ী বা গভীর সাহিত্যিক মূল্য ছিল না। বাণীর গভীরতার চেয়ে অনুপ্রাসের অহংকার এবং শব্দের মারপ্যাঁচই প্রধান হয়ে উঠেছিল।

 * **রুচির অবক্ষয়:** বাবু সংস্কৃতির মোহে পড়ে সমাজে এক ধরণের সস্তা, তরল এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণ মানসিকতা তৈরি হচ্ছিল, যা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে তরান্বিত করছে বলে মনে করা হতো।

> **সংক্ষেপে:** অবক্ষয় যুগের এই গানগুলি একদিকে যেমন বাংলা গানকে দেবালয় থেকে মুক্ত করে মানুষের মাটির পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছিল, ঠিক তেমনি অতিরিক্ত সস্তা জনমনোরঞ্জনের তাগিদে এটি সামাজিকভাবে কিছুটা রুচিহীনতার দায়েও দুষ্ট হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালের আধুনিক বাংলা গানের (যেমন রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল বা রবীন্দ্রনাথের গান) ভিত্তি তৈরিতে এই যুগের নিরীক্ষাগুলো পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...