Skip to main content

বলাই গল্পটিতে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং তার করুন পরিনতি ফুটেছে তা আলোচনা করো।

বলাই গল্পটিতে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং তার করুন পরিনতি ফুটেছে তা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাই’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড়, আত্মিক সম্পর্কের এক অনন্য দলিল।আর এই গল্পে একদিকে যেমন প্রকৃতির প্রতি এক অবুঝ বালকের গভীর ও নিষ্কাম ভালোবাসা ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনই মানুষের চরম উপযোগিতাবাদী ও নিষ্ঠুর মানসিকতার কারণে সৃষ্ট এক করুণ পরিণতি চিত্রিত হয়েছে।আর এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই -

     ১. প্রকৃতি ও বলাইয়ের নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলাইয়ের সত্তা জুড়ে ছিল কেবল প্রকৃতি। সাধারণ মানুষ প্রকৃতিকে যেভাবে বস্তুগত বা উপযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে, বলাই তা দেখেনি। তার কাছে গাছপালা, ঘাস, লতা-পাতা সবই ছিল সজীব এবং অনুভূতির অধিকারী। আর সেখানে-

        বলাই যেন প্রকৃতির ভাষা শুনতে পেত। ঘাসের ওপর দিয়ে যখন কেউ হেঁটে যেত, তখন তার মনে হতো ঘাসের বুকের ভেতরের কান্না সে শুনতে পাচ্ছে। শুধু তাই নয়- গল্পটিতে আছে নিষ্কাম ভালোবাসা। যেখানে আমরা দেখতে পাই, ফুল তোলার জন্য কেউ গাছের ডাল ভাঙলে তার অন্তরে আঘাত লাগত। তার এই ভালোবাসা কোনো স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এটি ছিল সম্পূর্ণ নিঃশর্ত ও আত্মিক।

      ২. মানুষ বলাইয়ের বৈপরীত্য (কাকাবাবুর উপযোগিতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি)।গল্পে বলাইয়ের কাকাবাবু হলেন বাস্তববাদী ও যুক্তিপ্রবণ মানবসমাজের প্রতিনিধি। মানুষের কাছে প্রকৃতি তখনই মূল্যবান, যখন তা মানুষের কোনো উপদেশে বা কাজে লাগে।পথের মাঝে একটি শিমুল গাছ গজিয়ে উঠলে বলাই সেটিকে নিজের পরম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে এবং প্রতিদিন তার পরিচর্যা করে।

       অন্যদিকে, কাকাবাবুর কাছে সেই গাছটি ছিল কেবলই এক "অনাবশ্যক উপদ্রব", যা বাগানের সৌন্দর্য ও পথ নষ্ট করছিল। মানুষের এই নির্মম বাস্তবতাবোধ ও প্রকৃতির প্রতি উদাসীনতা বলাইয়ের কোমল মনের পরিপন্থী ছিল।

       ৩. কাকীমার মাতৃত্ব ও প্রকৃতির মেলবন্ধন।গল্পে কাকীমার চরিত্রটি বলাই এবং প্রকৃতির মাঝখানে এক চমৎকার সেতু তৈরি করেছে। বলাইয়ের মা নেই, তাই কাকীমার মাতৃত্বের সবটুকু স্নেহ ঢেলে দিয়েছিলেন বলাইয়ের ওপর। বলাই যখন শিমুল গাছটিকে বাঁচানোর জন্য কাকীমার কাছে আকুল আবেদন জানায়: *"কাকীমা, তুমি তোমার মালীকে বারণ করে দাও, ও যেন আমার শিমুল গাছটা না কাটে।"* তখন কাকীমা বলাইয়ের আবদার রক্ষা করেন। এখানে কাকীমার মাতৃত্ব কেবল বলাইয়ের প্রতি নয়, বলাইয়ের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রকৃতির প্রতিও প্রসারিত হয়েছিল।

     ৪. করুণ পরিণতি।গল্পের শেষভাগে প্রকৃতি ও মানুষের এই সম্পর্কের টানাপোড়েন এক চরম এবং হৃদয়বিদারক পরিণতি লাভ করে।বলাইয়ের বিদায়,পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বলাইকে যখন শিমুল গাছ ও তার প্রিয় প্রকৃতি ছেড়ে বিলেতে (লন্ডনে) চলে যেতে হয়, তখন থেকেই তার জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

       শিমুল গাছ ছেদন, বলাই চলে যাওয়ার পর কাকাবাবু তাঁর বাস্তববাদী বুদ্ধির বশে সেই "অবাঞ্ছিত" শিমুল গাছটিকে কেটে ফেলেন। তিনি বলাইয়ের আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।

      কাকীমার শূন্যতা ও শোক,বিলেত থেকে বলাই তার প্রিয় শিমুল গাছটির একটি ছবি তুলে পাঠাতে অনুরোধ করে। কিন্তু ততক্ষণে গাছটি কাটা হয়ে গেছে। এই খবর শুনে কাকীমা তীব্র শোকে ভেঙে পড়েন। তিনি দুদিন অন্ন গ্রহণ করেননি।

 "বলাইয়ের মা এসে যে কোল শূন্য করে দিয়ে গিয়েছিল, সেই কোল ও আর পূরণ করতে দিলে না।"

      কাকীমার কাছে সেই শিমুল গাছটি আর কেবল একটি গাছ ছিল না, সেটি হয়ে উঠেছিল খোদ বলাইয়েরই এক জীবন্ত রূপক। গাছটিকে কেটে ফেলার অর্থ ছিল বলাইকে তাদের জীবন থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলা।

        রবীন্দ্রনাথ 'বলাই' গল্পে দেখিয়েছেন যে, মানুষ নিজের স্বার্থ ও সুন্দরের কৃত্রিম সংজ্ঞার খাতিরে কীভাবে প্রকৃতির সহজ-সরল রূপকে ধ্বংস করে। মানুষের এই অহংকার ও নির্মমতার শিকার হতে হয় বলাইয়ের মতো কোমলপ্রাণদের। এই গল্পটি আসলে মানুষের অন্ধ অহমিকার বিরুদ্ধে প্রকৃতির হয়ে এক নীরব, অথচ তীব্র প্রতিবাদ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH SIR 


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...