Skip to main content

সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতার পতনের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সিলেবাস।


# সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার পতনের প্রধান কারণসমূহ

### ভূমিকা

প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুপরিকল্পিত নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা—হরপ্পা সভ্যতা—খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দ নাগাদ তার গৌরব হারাতে শুরু করে এবং আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দের মধ্যে এর চূড়ান্ত পতন ঘটে। তবে কোনো একটি একক কারণে এই বিশাল সভ্যতার পতন ঘটেনি। আধুনিক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, একাধিক প্রাকৃতিক, পরিবেশগত এবং মানবসৃষ্ট কারণের যৌথ প্রভাবেই এই উন্নত নগর-সভ্যতা ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছিল।

## পতনের কারণসমূহের শ্রেণীবিন্যাস

হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণগুলিকে মূলত তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যায়:

### ১. প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত কারণ (가장 গুরুত্বপূর্ণ কারণ)

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানী মনে করেন, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাই ছিল এই সভ্যতার পতনের মূল অনুঘটক।

 * **জলবায়ুর পরিবর্তন ও অনাবৃষ্টি:** ঐতিহাসিক **আরেল স্টেইন** (Aurel Stein) এবং **এ. এন. ঘোষ**-এর মতে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের পর থেকে সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে যায়। জলবায়ুর এই শুষ্কতার কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হয় এবং তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়, যা নগর জীবনকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।

 * **নদীর গতিপথ পরিবর্তন:** সিন্ধু নদ এবং তার উপনদীগুলির গতিপথ পরিবর্তন হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের অন্যতম বড় কারণ। বিজ্ঞানী **এইচ. টি. ল্যামব্রিক** (H.T. Lambrick) দেখিয়েছেন যে, সিন্ধু নদ তার মূল গতিপথ থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে সরে গেলে মহেঞ্জোদাড়ো ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি জলের অভাবে মরুভূমিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে, উপগ্রহ চিত্রের সাহায্যে জানা গেছে যে প্রাচীন **সরস্বতী নদী** শুকিয়ে যাওয়ার ফলে কালিবঙ্গান ও বানাওয়ালির মতো প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।

 * **বিধ্বংসী বন্যা:** ঐতিহাসিক **রাবার্ট রায়েকস** (Robert Raikes) এবং **মার্শাল**-এর মতে, সিন্ধু নদের ভয়াবহ এবং বারবার ফিরে আসা বন্যা এই সভ্যতার পতনের জন্য দায়ী। মহেঞ্জোদাড়ো খনন করে পলিমাটির সাতটি স্তর পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে এই শহরটি অন্তত সাতবার বন্যার কবলে পড়েছিল এবং বারবার পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে নাগরিকরা তাদের অর্থনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল।

 * **ভূমিকম্প ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন:** ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, সিন্ধু উপত্যকার ভূ-গর্ভস্থ প্লেটের আলোড়নের ফলে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যায়। এর ফলে নদীর জল উপচে চারপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে এবং এক স্থায়ী জলমগ্নতার সৃষ্টি হয়, যা নগরবাসীকে শহর ছাড়তে বাধ্য করে।

### ২. অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ

 * **অরণ্য নিধন ও মাটির ক্ষয়:** হরপ্পার বিশাল নগরগুলিতে কোটি কোটি পোড়া ইট তৈরির জন্য এবং ব্রোঞ্জ গলানোর চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণ কাঠ পোড়ানো হতো। ঐতিহাসিক **ডি. ডি. কোসাম্বী** (D.D. Kosambi) মনে করেন, এই লাগামহীন বৃক্ষছেদনের ফলে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়, মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে।

 * **বাণিজ্যিক মন্দা:** হরপ্পা সভ্যতার সমৃদ্ধি টিকে ছিল মূলত মেসোপটেমিয়ার সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর। খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের পর মেসোপটেমিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে হরপ্পার বণিক সমাজ অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে এবং নগরগুলির রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

 * **প্রশাসনিক শৈথিল্য:** পতনের শেষ পর্বে হরপ্পার নগরগুলিতে পুরসভা বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়েছিল। চওড়া রাস্তাঘাট দখল করে ছোট ছোট ঘর তৈরি হওয়া, নর্দমা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নিম্নমানের ইটের ব্যবহার প্রমাণ করে যে শেষ সময়ে কোনো শক্তিশালী শাসন কাঠামো অবশিষ্ট ছিল না।

### ৩. মানবসৃষ্ট ও বহিরাগত কারণ

 * **আর্য আক্রমণ তত্ত্ব:** ১৯৪০-এর দশকে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক **রমাগ্রসাদ চন্দ** এবং পরবর্তীতে **মর্টিমার হুইলার** (Mortimer Wheeler) দাবি করেন যে, বহিরাগত আর্যদের বর্বর আক্রমণেই এই সভ্যতার পতন ঘটেছিল। হুইলার মহেঞ্জোদাড়ো থেকে প্রাপ্ত ৩০টিরও বেশি কঙ্কালের গায়ে আঘাতের চিহ্ন এবং ঋগ্বেদে বর্ণিত ইন্দ্রের 'পুরন্দর' (দুর্গ ধ্বংসকারী) উপাধিকে তাঁর সপক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

   > **আধুনিক বিতর্ক:** বর্তমান ঐতিহাসিকরা (যেমন **কে. এ. আর. কেনেডি**) এই আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। কঙ্কালগুলির ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে সেগুলি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের নয়, বরং মহামারী বা সাধারণ মৃত্যুর নিদর্শন। তাছাড়া, আর্যদের ভারতে আগমনের বহু আগেই হরপ্পা সভ্যতার অবসান ঘটেছিল।

   > 

## পতনের কারণগুলির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা (সারাংশ)

ঐতিহাসিকদের ভিন্ন ভিন্ন মতবাদকে একটি তালিকার মাধ্যমে সহজে বোঝা সম্ভব:


| ঐতিহাসিক / বিজ্ঞানী | পতনের প্রধান কারণ |

| :--- | :--- |

| **মর্টিমার হুইলার** | বহিরাগত আর্য আক্রমণ |

| **আরেল স্টেইন ও এ. এন. ঘোষ** | জলবায়ুর পরিবর্তন ও শুষ্কতা |

| **রাবার্ট রায়েকস ও জন মার্শাল** | সিন্ধু নদের বিধ্বংসী বন্যা |

| **এইচ. টি. ল্যামব্রিক** | নদীর গতিপথ পরিবর্তন |

| **ডি. ডি. কোসাম্বী** | অতিরিক্ত অরণ্য নিধন ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি |


## মূল্যায়ন ও উপসংহার

আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণার নিরিখে বলা যায়, হরপ্পা সভ্যতার পতন কোনো এক রাতে বা কোনো একটি নির্দিষ্ট দুর্ঘটনায় ঘটেনি। এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ধীর প্রক্রিয়া (Decline)।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন খরা, বন্যা বা নদীর গতিপথ পরিবর্তন) যখন কৃষিব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর। অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় প্রশাসন ভেঙে পড়ে। ফলে নাগরিকরা এই বিশাল নগরগুলি পরিত্যাগ করে ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে (গাঙ্গেয় উপত্যকা ও গুজরাটে) ছোট ছোট গ্রামীণ বসতি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, হরপ্পা সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটেনি, বরং তার **'নগরায়ণ রূপটির'** অবসান ঘটেছিল।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...