নাথ সাহিত্য কাকে বলে ? নাথ সাহিত্যের কয়টি ভাগ ও কী কী?নাথ সাহিত্যের মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় লেখো। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাথ সাহিত্যের গুরুত্ব কতটা তা আলোচনা করো।
নাথ সাহিত্য কাকে বলে ? নাথ সাহিত্যের কয়টি ভাগ ও কী কী?নাথ সাহিত্যের মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় লেখো। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাথ সাহিত্যের গুরুত্ব কতটা তা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মেজর(ইউনিট৪)/মাইনর(ইউনিট-৩) প্রথম সেমিস্টার ।
আমরা জানি যে,বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের আদি-মধ্য পর্বে (বিশেষত শিবায়ন কাব্য ও মঙ্গলকাব্যের সমসময়ে) লোকধর্মকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ একশ্রেণীর আখ্যানকাব্য গড়ে উঠেছিল, তা নাথ সাহিত্য নামে পরিচিত।তবে 'নাথ' শব্দের সাধারণ অর্থ প্রভু, স্বামী বা রক্ষাকর্তা। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া মত, তান্ত্রিকতা এবং শৈব ধর্মের সংমিশ্রণে ভারতে 'নাথপন্থী' নামে এক সাধনমার্গের উদয় হয়।আর সেখানে-
নাথপন্থার গুরুদের অলৌকিক মহিমা, সাধন-পদ্ধতি এবং তাঁদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লোকগাথাকে অবলম্বন করে মধ্যযুগে যে সাহিত্য রচিত হয়েছিল, তাকেই নাথ সাহিত্য বলা হয়। এই সাহিত্যের আদি দেবতা হলেন স্বয়ং শিব (যিনি 'আদিনাথ' নামে পরিচিত) এবং প্রধান চরিত্ররা হলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, জলন্ধরীপাদ বা হাড়িপা, এবং ময়নামতী-গোপীচাঁদ।
২) নাথ সাহিত্যের বিভাগঃনাথ সাহিত্যকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।আর সেই ভাগগুলি হলো-
ক) গোরক্ষবিজয় বা মীনচেতন শাখাঃ এই শাখার মূল উপজীব্য হলো নাথধর্মের শ্রেষ্ঠ গুরু গোরক্ষনাথের সাধন-মাহাত্ম্য। গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ (বা মীননাথ) কদলী রাজ্যে নারীসংসর্গে এসে নিজের যোগধর্ম ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর শিষ্য গোরক্ষনাথ নানারূপ ছদ্মবেশে (যেমন নর্তকী) সেখানে প্রবেশ করেন এবং গুরুকে মোহমুক্ত করে সিদ্ধি মার্গে ফিরিয়ে আনেন। এই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে শেখ ফয়জুল্লাহ 'গোরক্ষবিজয়' কাব্য রচনা করেন।
খ) ময়নামতী-গোপীচাঁদের গান শাখাঃ এই শাখাটি উত্তর ও পূর্ব বঙ্গে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। রানী ময়নামতী ছিলেন সিদ্ধা জলন্ধরীপাদের (হাড়িপা) শিষ্যা। তিনি যোগবলে জানতে পারেন যে তাঁর পুত্র রাজা গোপীচাঁদের অল্প বয়সেই মৃত্যুযোগ রয়েছে। পুত্রকে অমরত্ব দেওয়ার জন্য ময়নামতী তাঁকে বাধ্য করেন সংসার ও তরুণী স্ত্রীদের মায়া ত্যাগ করে হাড়িপার কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসী হতে। গোপীচাঁদের এই বৈরাগ্য ও সন্ন্যাসযাত্রার কাহিনী নিয়ে ভবানীদাস, দুর্লভ মল্লিক প্রমুখ কবিরা কাব্য রচনা করেন।
৩)নাথ সাহিত্যের মূল বক্তব্যঃ নাথ সাহিত্যের মূল দর্শন ও বক্তব্য অলৌকিক কাহিনীর আবরণে ঢাকা থাকলেও এর গভীরে রয়েছে কঠোর দেহকেন্দ্রিক যোগসাধনার কথা। এর মূল বক্তব্যগুলি নিম্নরূপ-
•কায়াসাধন বা দেহবাদঃ নাথপন্থীদের মূল কথা হলো-"যা নেই ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে এই কাণ্ডে (দেহে)"। তাঁরা বিশ্বাস করতেন মানুষের শরীরই হলো সমস্ত সাধনার মূল কেন্দ্র। শরীরকে জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর হাত থেকে মুক্ত করে দীর্ঘজীবী বা অমর হওয়াই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।
• বিন্দুধারণ বা সংযমঃ এই সাহিত্যের মূল নীতি হলো কঠোর ইন্দ্রিয় সংযম। নারীসংসর্গ বা কামকে যোগীগণের পতনের মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিন্দু (শুক্র) রক্ষা করে তাকে মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে উর্ধ্বে চালিত করে সহস্রারে স্থিত করাই ছিল সিদ্ধিলাভের উপায়। গোরক্ষনাথের চরিত্রটির মাধ্যমে এই কঠোর ব্রহ্মচর্যের বাণীই প্রচারিত হয়েছে।
গুরুবাদঃ নাথ ধর্মে গুরুর স্থান ঈশ্বরের সমকক্ষ। গুরু ছাড়া মোক্ষ বা জ্ঞান লাভ অসম্ভব। মীননাথের মতো মহাসিদ্ধ পুরুষও গুরুহীন বা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লে শিষ্যের রূপ ধরে আসা গুরুরূপী গোরক্ষনাথই তাঁকে উদ্ধার করেন।
৪) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাথ সাহিত্যের গুরুত্বঃ বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন এবং তৎকালীন সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাস বুঝতে নাথ সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। আর সেখানে আমরা দেখি-
১)ধর্মীয় সমন্বয়ের প্রতীকঃ নাথ সাহিত্য কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে হিন্দু পৌরাণিক শিবের লৌকিক রূপ, বৌদ্ধ সহজযানের শূন্যবাদ এবং পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মের সুফিবাদের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। বহু মুসলমান কবি (যেমন শেখ ফয়জুল্লাহ, শুকুর মহম্মদ) অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে এই কাব্যগুলি রচনা করেছিলেন, যা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার আদি নিদর্শন।
২) সামাজিক ইতিহাসের দলিলঃ মঙ্গলকাব্যগুলিতে যখন দেবদেবীর স্তুতি আর চাটুকারিতা চলছিল, নাথ সাহিত্য তখন সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প বলেছে। উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জীবন, ময়নামতীর অলৌকিক ক্ষমতা, গোপীচাঁদের প্রাসাদ ছেড়ে হাড়িপার (যিনি জাতিতে ঝাড়ুদার বা অন্ত্যজ শ্রেণীর ছিলেন) পায়ে লুটিয়ে পড়ার কাহিনী তৎকালীন সমাজে জাতিভেদ প্রথার ওপর এক বড় আঘাত ছিল।
৩) লৌকিক শিবের রূপান্তরঃ এই সাহিত্যে আর্য সংস্কৃতির কৈলাসবাসী গম্ভীর শিব হয়ে গেছেন চাষাভুষো, ভাঙড় ও লৌকিক জগতের একজন মানুষ। শিবের এই 'লৌকিকীকরণ' পরবর্তীকালের শিবায়ন ও মঙ্গলকাব্য গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
৪) ভাষার বিবর্তনঃ নাথ সাহিত্যের ভাষা বাংলা ভাষার আদি ও মধ্য যুগের সন্ধিক্ষণের এক রূপ। এর ছড়া ও গানগুলির মধ্যে প্রাচীন চর্যাপদের ভাষার যেমন রেশ আছে, তেমনই মধ্যযুগের পয়ার ছন্দের বিকাশও লক্ষ্য করা যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, নাথ সাহিত্য কেবল অলৌকিক যোগীদের গল্প নয়, এটি ছিল তৎকালীন বাংলার অবহেলিত, নিম্নবর্গের মানুষের নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতির সাহিত্যিক রূপ প্রকাশ। দেব-মাহাত্ম্যের ভিড়ে মানব-চরিত্রের দৃঢ়তা (যেমন গোরক্ষনাথের চরিত্র) এবং মাতৃস্নেহের মহিমা (যেমন ময়নামতী) ফুটিয়ে তুলে এই সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে এক অনন্য বৈচিত্র্য দান করেছে।
ঠিক এরূপ অস়ংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা,সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundorbon YouTube channel SAMARESH SIR
Comments
Post a Comment