Skip to main content

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে প্রকৃতি চেতনা কিভাবে জীবন দর্শনের সাথে মিশে গেছে- তা আলোচনা করো।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে প্রকৃতি চেতনা কিভাবে জীবন দর্শনের সাথে মিশে গেছে- তা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।

        বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এমন এক ব্যতিক্রমী কথাসাহিত্যিক, যাঁর উপন্যাসে ও ছোটগল্পে প্রকৃতি কেবল মানবকাহিনীর পটভূমি বা অলংকার হিসেবে আসেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে উপন্যাসের অন্যতম প্রধান জীবন্ত চরিত্র। তাঁর সৃষ্টিতে প্রকৃতিচেতনা ও জীবনদর্শন এমনভাবে মিলেমিশে গেছে যে, প্রকৃতিকে বাদ দিলে তাঁর জীবনদর্শন অপূর্ণ থেকে যায়। আর সেই প্রেক্ষিতে বিভূতিভূষণের কথাসাহিত্যে প্রকৃতি ও জীবনদর্শনের এই নিবিড় সংযোগ মূলত কয়েকটি প্রধান দিক থেকে আলোচনা করা যায়-

       •প্রকৃতি ও মানুষের অভিন্নতা (অদ্বৈত রূপ)।বিভূতিভূষণের জীবনদর্শনের মূলে ছিল মানুষ ও প্রকৃতির একাত্মতা। তাঁর কাছে অরণ্য, নদী, আকাশ এবং বনের পশুপাখি মানুষের মতোই সমানুভূতিশীল।‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ অপু ও দুর্গার বেড়ে ওঠার পেছনে গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতির অবদান মায়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বাঁশবাগান, খড়কুটোর গন্ধ, মেঘলা আকাশ অপুর শৈশব ও কৈশোরের চেতনাকে গড়ে তুলেছে। অপুর কাছে প্রকৃতি ছিল এক পরম আশ্রয়, যেখানে গিয়ে সে তার সব দুঃখ ভুলে যেত।আবার-

      ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে লবটুলিয়া, ফুলকিয়া বইহারের যে বিশাল অরণ্যপ্রকৃতি, তা নায়ক সত্যচরণের নাগরিক অহংকারকে ভেঙে চূর্ণ করে দেয়। অরণ্যের সান্নিধ্যে এসে সত্যচরণ বুঝতে পারে যে, প্রকৃতির বিশালতার সামনে মানুষের ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া কতখানি তুচ্ছ।

       • অধ্যাত্মচেতনা ও কৌতূহল।বিভূতিভূষণের প্রকৃতিচেতনা শেষ পর্যন্ত এক গভীর রহস্যময় অধ্যাত্মচেতনা ও জীবনদর্শনে রূপ নিয়েছে। তিনি প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধের আড়ালে এক অদৃশ্য পরম সত্তার উপস্থিতি অনুভব করতেন।

       তাঁর উপন্যাসের চরিত্ররা (যেমন অপু বা সত্যচরণ) প্রায়শই নির্জন প্রকৃতির মাঝে একা বসে নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের সুদূরপ্রসারী রহস্য নিয়ে ভাবত।এই মহাবিশ্বের উৎস কী, মৃত্যুর ওপারে কী আছে—এইসব দার্শনিক প্রশ্ন তাঁদের মনে জেগে উঠত প্রকৃতির অসীমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। প্রকৃতির রূপের মাধ্যমেই তিনি জীবনের এক চিরন্তন, শাশ্বত ও ঈশ্বরীয় রূপের সন্ধান পেয়েছিলেন।

        •আদিম ও অকৃত্রিম জীবনের সন্ধান।শহুরে যান্ত্রিক সভ্যতার কৃত্রিমতা বিভূতিভূষণকে বারবার পীড়িত করেছে। তাই তাঁর জীবনদর্শন সবসময় সন্ধান করেছে প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা আদিম, সরল ও অকৃত্রিম জীবনযাত্রাকে।

      ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে অরণ্যের আদিবাসী রাজু পাঁড়ে, ধাওতাল সাহু বা ভানুমতীর মতো চরিত্ররা প্রকৃতির মতোই সরল ও ছলাকলাহীন।প্রকৃতি মানুষের ভেতরের লোভ-লালসাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। বিভূতিভূষণের দর্শন বলে—মানুষ যত প্রকৃতির কাছাকাছি থাকবে, তার জীবন তত বেশি পবিত্র ও আনন্দময় হবে।

"প্রকৃতি যেন এক পরম জননী, যিনি সভ্যতার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মানুষকে তাঁর শান্তিনিকেতনে পরম স্নেহে কোল দেন।" -এই অনুভুতিই বিভূতিভূষণের সাহিত্যের মূল সুর।

    • ক্ষণভঙ্গুরতা ও মহাকালের চেতনা। বিভূতিভূষণ প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের মাঝে জীবনের এক গভীর দর্শন খুঁজে পেয়েছিলেন। বসন্তের পর যেমন বর্ষা আসে, তেমনি মানুষের জীবনেও সুখের পর দুঃখ আসে।

       প্রকৃতি যেমন একদিকে সুন্দর ও জীবনদায়ী, অন্যদিকে তেমনই তা উদাসীন ও ধ্বংসাত্মক। ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে মানুষের প্রয়োজনে অরণ্য কাটার যে নির্মম ছবি আছে, তা সভ্যতার আগ্রাসী রূপকে দেখায়।

      কিন্তু সব ধ্বংসের পরেও প্রকৃতি আবার নিজের নিয়মে সেজে ওঠে। এই চক্রাকার পরিবর্তন বিভূতিভূষণকে শিখিয়েছিল যে, মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট মহাকালের নিয়মে অত্যন্ত সাময়িক। তাই তাঁর চরিত্রদের মধ্যে এক ধরণের নির্লিপ্ত, শান্ত ও উদাসীন জীবনদর্শন গড়ে ওঠে, যা তাঁদের জীবনের বড় বড় বিপর্যয়ও সহজে মেনে নিতে সাহায্য করে।

      পরিশেষে বলা যায় যে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে প্রকৃতি কেবল দেখার বস্তু নয়, তা হলো অনুভব করার বিষয়। প্রকৃতি তাঁর কাছে ছিল একাধারে শিক্ষক, মাতা এবং ঈশ্বর। প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের জীবনের সার্থকতা ও পরম সত্যকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর প্রকৃতিচেতনা কোনো বাহ্যিক বিলাসিতা নয়, তা ছিল তাঁর জীবনদর্শনেরই এক অবিচ্ছেদ্য এবং প্রাণবন্ত অংশ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH SIR 


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...