Skip to main content

পরামর্শদানের প্রকারভেদ হিসেবে নির্দেশমূলক পরামর্শদান এবং অনির্দেশিমূলক পরামর্শদানের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।



পরামর্শদান বা কাউন্সেলিং (Counseling) প্রক্রিয়ায় **নির্দেশমূলক পরামর্শদান (Directive Counseling)** এবং **অনির্দেশিমূলক পরামর্শদান (Non-directive Counseling)** হলো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিপরীতধর্মী পদ্ধতি। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাসের উপযুক্ত কাঠামো অনুযায়ী নিচে এই দুটির বিস্তারিত তুলনামূলক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

## নির্দেশমূলক বনাম অনির্দেশিমূলক পরামর্শদান

পরামর্শদানের এই দুটি পদ্ধতির মূল পার্থক্য লুকিয়ে রয়েছে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কার ভূমিকা বেশি—পরামর্শদাতার (Counselor) নাকি পরামর্শগ্রহীতার (Client)।

 * **নির্দেশমূলক পরামর্শদান:** এই পদ্ধতির প্রবক্তা হলেন **ই. জি. উইলিয়ামসন (E. G. Williamson)**। এটি সম্পূর্ণভাবে **পরামর্শদাতা-কেন্দ্রিক (Counselor-centered)**। এখানে পরামর্শদাতা সক্রিয় ভূমিকা নেন, সমস্যা বিশ্লেষণ করেন এবং পরামর্শগ্রহীতাকে সমাধানের পথ নির্দেশ করেন।

 * **অনির্দেশিমূলক পরামর্শদান:** এই পদ্ধতির প্রবক্তা হলেন **কার্ল রজার্স (Carl Rogers)**। এটি সম্পূর্ণভাবে **পরামর্শগ্রহীতা-কেন্দ্রিক (Client-centered)**। এখানে পরামর্শগ্রহীতা নিজেই নিজের সমস্যা প্রকাশ করে এবং পরামর্শদাতা কেবল একজন নিষ্ক্রিয় শ্রোতা বা সহায়কের ভূমিকা পালন করেন।

## মূল পার্থক্যের তুলনামূলক সারণী

নিচের ছকের সাহায্যে এই দুটি পদ্ধতির মূল পার্থক্যগুলি সহজে বোঝা সম্ভব:


| তুলনার ভিত্তি | নির্দেশমূলক পরামর্শদান (Directive) | অনির্দেশিমূলক পরামর্শদান (Non-directive) |

| :--- | :--- | :--- |

| **১. প্রবক্তা** | ই. জি. উইলিয়ামসন (E. G. Williamson) | কার্ল রজার্স (Carl Rogers) |

| **২. মূল কেন্দ্র** | এটি পরামর্শদাতা-কেন্দ্রিক বা সমস্যা-কেন্দ্রিক। | এটি পরামর্শগ্রহীতা-কেন্দ্রিক বা ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। |

| **৩. পরামর্শদাতার ভূমিকা** | এখানে পরামর্শদাতা অত্যন্ত সক্রিয়, নির্দেশক ও কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। | এখানে পরামর্শদাতা মূলত একজন সহায়ক, সহমর্মী শ্রোতা ও পথপ্রদর্শক। |

| **৪. পরামর্শগ্রহীতার ভূমিকা** | পরামর্শগ্রহীতা এখানে তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে এবং নির্দেশ মেনে চলে। | পরামর্শগ্রহীতা অত্যন্ত সক্রিয় থাকে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়। |

| **৫. বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার গুরুত্ব** | এখানে পরামর্শদাতার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়। | এখানে পরামর্শগ্রহীতার আবেগ, আত্মোপলব্ধি এবং স্বাধীন ইচ্ছার ওপর জোর দেওয়া হয়। |

| **৬. সমস্যার সমাধান** | পরামর্শদাতা নিজেই সমস্যার সরাসরি সমাধান বা প্রেসক্রিপশন দিয়ে দেন। | পরামর্শগ্রহীতা নিজের ভেতরের ক্ষমতা আবিষ্কার করে নিজেই সমস্যার সমাধান খুঁজে নেয়। |

| **৭. সময়সীমা** | এই পদ্ধতিটি কম সময়সাপেক্ষ এবং দ্রুত ফলদায়ী। | এটি দীর্ঘমেয়াদী এবং মানসিক পরিবর্তনের জন্য অনেক বেশি সময় লাগে। |


## বিষদ বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক আলোচনা

শিক্ষাবিদদের মতে, এই দুটি পদ্ধতির আদর্শগত এবং ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পূর্ণ আলাদা। এদের তুলনামূলক আলোচনার প্রধান দিকগুলি নিচে দেওয়া হলো:

### ১. দর্শনের পার্থক্য (Difference in Philosophy)

নির্দেশমূলক পরামর্শদানের মূল বিশ্বাস হলো, সাধারণ মানুষ বা শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যা নিজে সমাধান করতে সব সময় সক্ষম হয় না; তাই অভিজ্ঞ কারোর নির্দেশ প্রয়োজন। অন্যদিকে, অনির্দেশিমূলক পরামর্শদান বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই নিজের সমস্যার সমাধান করার এবং আত্মবিকাশ ঘটানোর সুপ্ত ক্ষমতা রয়েছে।

### ২. তথ্যের ব্যবহার (Use of Data)

নির্দেশমূলক পদ্ধতিতে কেস হিস্ট্রি, পরীক্ষার ফলাফল এবং বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক অভীক্ষার (Tests) মাধ্যমে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু অনির্দেশিমূলক পদ্ধতিতে বাহ্যিক তথ্যের চেয়ে পরামর্শগ্রহীতার বর্তমান মানসিক অনুভূতি এবং সে নিজের সমস্যাকে কীভাবে দেখছে, তাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

### ৩. নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতা (Control vs. Freedom)

নির্দেশমূলক ব্যবস্থায় কাউন্সেলিং-এর পুরো প্রক্রিয়াটি পরামর্শদাতার নিয়ন্ত্রণে থাকে। তিনি ঠিক করেন পরবর্তী ধাপ কী হবে। বিপরীতপক্ষে, অনির্দেশিমূলক ব্যবস্থায় পরামর্শগ্রহীতা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। সে কী বলবে, কতটা বলবে—তা সম্পূর্ণ তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

> **উপসংহার:** শিক্ষাক্ষেত্রে বা বাস্তব জীবনে কোনো পদ্ধতিই এককভাবে ত্রুটিহীন নয়। কম বয়সী শিক্ষার্থী বা তীব্র বিভ্রান্তির শিকার হওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে **নির্দেশমূলক পদ্ধতি** বেশি কার্যকর। আবার প্রাপ্তবয়স্ক, আবেগপ্রবণ বা মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে **অনির্দেশিমূলক পদ্ধতি** স্থায়ী সমাধান এনে দেয়। আধুনিক শিক্ষায় তাই প্রয়োজন অনুযায়ী এই দুইয়ের মিশ্রণে **নমনীয় বা সমন্বয়ধর্মী পরামর্শদান (Eclectic Counseling)** ব্যবহার করা হয়।

>

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...