গণতন্ত্র কাকে বলে ? গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি লেখো। আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রকৃতি বিশদে আলোচনা করো।
গণতন্ত্র কাকে বলে ? গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি লেখো। আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রকৃতি বিশদে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আমরা জানি যে,'গণতন্ত্র' শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Democracy'।আর এই শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'Demos' (যার অর্থ জনগণ) এবং 'Kratos' (যার অর্থ ক্ষমতা বা শাসন) থেকে। অর্থাৎ, ব্যুৎপত্তিগত অর্থে গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন।আরোও সহজ ভাষায় বলা যায় যে-
যে শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তি বা শ্রেণির হাতে না থেকে সমাজের সাধারণ জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে এবং জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে (প্রতিনিধির মাধ্যমে) দেশ শাসনে অংশ নেয়, তাকে গণতন্ত্র বলে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে-আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের মতে:
"গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য শাসনব্যবস্থা।" (Democracy is the government of the people, by the people, for the people.)।
২. গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ (Salient Features of Democracy)
এ
১) জনগণের সার্বভৌমত্ব: গণতন্ত্রে ক্ষমতার মূল উৎস হলো জনগণ। জনগণই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারণ করে কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
২) প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার:জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে নির্দিষ্ট বয়সের (যেমন ভারতে ১৮ বছর) প্রতিটি নাগরিকের একটি করে ভোট দেওয়ার সমান অধিকার থাকে।
৩) আইনের শাসন:গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমান। ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সকলেই দেশের প্রচলিত আইনের অধীনে থাকে।
৪) নিয়মিত ও অবাধ নির্বাচন:একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর (যেমন ৪ বা ৫ বছর পর) নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে জনগণ সরকার পরিবর্তন করার সুযোগ পায়।
৫) মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা:নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সমাবেশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারগুলো সংবিধানে স্বীকৃত ও সুরক্ষিত থাকে।
৬) বহুদলীয় ব্যবস্থা: গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থাকে। এর ফলে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার প্রকৃত বিকল্প বা সুযোগ পায়।
৭) দায়বদ্ধতা:সরকারকে তার সমস্ত কাজের জন্য আইনসভা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
৩. আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রকৃতি (Nature of Democracy in Modern States)
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের রূপ ও প্রকৃতি বেশ জটিল এবং বহুমুখী। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে আমরা একে প্রধানত কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করতে পারি-
ক) পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র (Representative Democracy)ঃ প্রাচীন গ্রিসের মতো আধুনিক বিশাল জনসংখ্যার রাষ্ট্রে সকলের পক্ষে সরাসরি শাসনকার্যে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আধুনিক রাষ্ট্রে **পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র** দেখা যায়। এখানে জনগণ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজেদের প্রতিনিধি (যেমন MP বা MLA) নির্বাচন করে এবং এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আইন তৈরি ও দেশ পরিচালনা করেন।
খ) উদারনৈতিক গণতন্ত্র (Liberal Democracy)ঃ আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই 'উদারনৈতিক গণতন্ত্র' ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর প্রকৃতি হলো—এখানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনই শেষ কথা নয়, বরং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে এর গভীর সংযোগ রয়েছে।
গ) কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণা (Welfare State)ঃ আধুনিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। অর্থাৎ, রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি **সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র** প্রতিষ্ঠা করা আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ঘ) ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization of Power)ঃ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা একক কোনো কেন্দ্রের হাতে কুক্ষিগত থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামো (যেমন ভারত বা আমেরিকা) এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার (যেমন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও পৌরসভা) মাধ্যমে ক্ষমতা একেবারে তৃণমূল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ঙ) গণমাধ্যমের ভূমিকা (Role of Mass Media)ঃ আধুনিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াকে গণতন্ত্রের "চতুর্থ স্তম্ভ" (Fourth Estate) বলা হয়। এটি জনমত গঠনে, সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরতে এবং জনগণের সচেতনতা বাড়াতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
চ) সমসাময়িক সংকট ও চ্যালেঞ্জঃ আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রকৃতি আলোচনা করতে গেলে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়ে। আর সেই সীমাবদ্ধতা গুলি হলো-
অনেক সময় অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবে নির্বাচন প্রভাবিত হয়। এরই পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদের কারণে অনেক সময় সংখ্যালঘুদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।আবার আমলাতন্ত্রের অতিরিক্ত প্রভাব জনগণের প্রকৃত শাসনকে কিছুটা ম্লান করে দেয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রকৃতি কেবল একটি ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন মানুষের জীবনযাত্রার একটি দর্শন হয়ে উঠেছে। নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে গণতন্ত্রকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঠিক এরূপ অস়ংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা,সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundorbon YouTube channel SAMARESH SIR
Comments
Post a Comment