শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের পার্থক্য আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকেই দুটি প্রধান ভাবধারা বা দর্শনের মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা গেছে। একটি হলো ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য (Individualistic Aim)এবং অন্যটি হলো সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য (Socialistic Aim)।আর সেখানে ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের মূল কথা হলো-ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই সমাজ, তাই ব্যক্তির নিজস্ব সম্ভাবনা, রুচি ও স্বাধীনতার পূর্ণ বিকাশই শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের মূল কথা হলো মানুষ সামাজিক জীব, সমাজের কল্যাণ ও প্রগতির মধ্যেই ব্যক্তির কল্যাণ নিহিত; তাই সমাজকে বাদ দিয়ে ব্যক্তির কোনো পৃথক অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
১** | **মূল দর্শন** | এই মতবাদ অনুযায়ী, ব্যক্তিই চরম সত্য। সমাজ ব্যক্তির বিকাশের জন্য একটি মাধ্যম মাত্র। | এই মতবাদ অনুযায়ী, সমাজই চরম সত্য। ব্যক্তি সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বা একক মাত্র। |
| **২** | **শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য** | ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলি, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ স্বকীয় বিকাশ ঘটানো। | ব্যক্তিকে একজন আদর্শ, উৎপাদনশীল এবং সমাজ-সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। |
| **৩** | **ব্যক্তির স্বাধীনতা** | এখানে শিক্ষার্থীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়। জোরপূর্বক কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া সমর্থন করে না। | এখানে সমাজের প্রয়োজনে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে কিছুটা খর্ব বা নিয়ন্ত্রিত করা সমর্থন করা হয়। |
| **৪** | **পাঠ্যক্রমের প্রকৃতি** | পাঠ্যক্রম হয় শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, বৈচিত্র্যময় এবং নমনীয় (Flexible), যা শিক্ষার্থীর রুচি ও অভীক্ষার ওপর নির্ভরশীল। | পাঠ্যক্রম হয় সমাজ-কেন্দ্রিক, বৃত্তিমুখী এবং সুসংহত, যা সমাজের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণ করে। |
| **৫** | **শিক্ষণ পদ্ধতি** | প্রজেক্ট পদ্ধতি, ল্যাবরেটরি পদ্ধতি বা ডাল্টন প্ল্যানের মতো মনস্তাত্ত্বিক ও স্ব-শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়। | দলীয় আলোচনা, সামাজিক কাজ, সমষ্টিগত শৃঙ্খলা ও সহযোগিতামূলক শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়। |
| **৬** | **শৃঙ্খলার ধারণা** | এই লক্ষ্য 'মুক্ত শৃঙ্খলা' বা 'আত্ম-শৃঙ্খলা' (Self-discipline) সমর্থন করে। | এই লক্ষ্য 'সামাজিক শৃঙ্খলা' এবং নিয়মকানুনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকে গুরুত্ব দেয়। |
| **৭** | **রাষ্ট্র ও ব্যক্তি** | রাষ্ট্র ব্যক্তির কল্যাণের জন্য কাজ করবে এবং ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। | ব্যক্তি রাষ্ট্রের বা সমাজের স্বার্থে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকবে। |
| **৮** | **সমর্থকগণ** | রুশো, পেস্তালতসি, ফ্রয়েবেল, টি. পি. নান, এবং স্যার রবার্ট উইলিয়ামস প্রমুখ এই লক্ষ্যের সমর্থক। | প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হেগেল, কার্ল মার্ক্স এবং জন ডিউই প্রমুখ এই লক্ষ্যের প্রধান সমর্থক। |
| **৯** | **চরম রূপ** | এই লক্ষ্যের চরম রূপ হলো 'নৈরাজ্যবাদ' (Anarchism), যেখানে সমাজ বা নিয়মকানুনের কোনো স্থান নেই। | এই লক্ষ্যের চরম রূপ হলো 'ফ্যাসিবাদ' বা ' totalitarianism' (একনায়কতন্ত্র), যেখানে ব্যক্তি সম্পূর্ণ পরাধীন। |
| **১০** | **মূল্যায়ন বা দৃষ্টিভঙ্গি** | এটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত। | এটি মূলত সমাজতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত। |
### উপসংহার
শিক্ষার এই দুটি লক্ষ্যকে আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, আধুনিক শিক্ষাবিদদের মতে এরা আসলে একে অপরের পরিপূরক। স্যার পার্সি নান (Sir Percy Nunn) অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেছেন, *"ব্যক্তিত্বের বিকাশ সামাজিক পরিবেশ ছাড়া সম্ভব নয়।"* সমাজ ছাড়া ব্যক্তি যেমন পঙ্গু, তেমনই যোগ্য ব্যক্তি ছাড়া উন্নত সমাজ গঠন অসম্ভব।
তাই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় সাধন করা হয়েছে, যাকে শিক্ষার **'সমন্বয়তান্ত্রিক লক্ষ্য' (Synthetic Aim)** বলা হয়। অর্থাৎ, আধুনিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো— ব্যক্তির নিজস্ব সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো, যাতে সে সমাজকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।
Comments
Post a Comment