সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে যা জানো লেখো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সিলেবাস।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রাচীন বিশ্ব ইতিহাসে সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ – ১৭৫০ অব্দ) তার সমসাময়িক মিশরীয় বা মেসোপটেমীয় সভ্যতার চেয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল মূলত তার উন্নত ও বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনার (Town Planning) জন্য। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, কালিবঙ্গান, লোথাল প্রভৃতি প্রত্নক্ষেত্রগুলি খনন করে যে নগর কাঠামোর সন্ধান মিলেছে, তা প্রমাণ করে যে এই সভ্যতা কোনো গ্রামীণ বা আকস্মিক বিকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল এক অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নিখুঁত নগরায়নের প্রতীক।আর সেই নগর পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে। যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-
১. দ্বি-স্তরিক নগর বিন্যাস (Citadel and Lower Town)। আসলে হরপ্পা সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি প্রধান নগরই দুটি স্পষ্ট অংশে বিভক্ত ছিল। যার প্রথম অংশ হলো-
•দুর্গ অঞ্চল বা সিটাডেল (Citadel)। শহরের পশ্চিম দিকে একটি কৃত্রিম উঁচু ঢিবির ওপর এই সুরক্ষিত অংশটি তৈরি হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এখানে শাসক শ্রেণী বাস করতেন এবং প্রশাসনিক ভবন, শস্যাগার ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখানেই অবস্থিত ছিল।
•নিচের শহর (Lower Town)।সিটাডেলের পূর্ব দিকে তুলনামূলকভাবে নিচু ও অনেক বড় এলাকা জুড়ে সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য এই অংশটি গড়ে উঠেছিল। এটিও প্রাচীর দিয়ে ঘেরা থাকত।
২. গ্রিড পদ্ধতি ও চওড়া রাস্তাঘাট।হরপ্পার নগরগুলির রাস্তাঘাট কোনো এলোমেলোভাবে তৈরি হয়নি।রাস্তাগুলি একে অপরকে সমকোণে (90° কোণে)ছেদ করত, যা আধুনিক 'গ্রিড পদ্ধতি' (Grid System) বা দাবার বোর্ডের মতো বিন্যাস তৈরি করেছিল।
মহেঞ্জোদাড়োর প্রধান রাস্তাটি ছিল প্রায় ৩৪ ফুট চওড়া, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা 'রাজপথ' (King's Way) বলে অভিহিত করেছেন। অন্যান্য গলি রাস্তাগুলিও ৯ থেকে ১২ ফুট চওড়া ছিল। রাস্তাগুলি এমনভাবে তৈরি ছিল যাতে প্রাকৃতিকভাবে বাতাসের প্রবাহেই শহরের ধুলোবালি পরিষ্কার হয়ে যেত।
৩. উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পয়ঃপ্রণালী (Drainage System)।হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তার স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যা সমসাময়িক পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না।যেখানে-
•প্রতিটি বাড়ির নোংরা জল প্রথমে একটি ছোট নর্দমা দিয়ে এসে রাস্তার মূল বড় নর্দমায় মিশত।
•রাস্তার এই মূল নর্দমাগুলি ঢাকা দেওয়ার জন্য পোড়া ইট বা চওড়া পাথরের স্ল্যাব ব্যবহার করা হতো।
•নর্দমাগুলি পরিষ্কার করার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর 'ম্যানহোল' (Manholes) বা পরিদর্শনের গর্তের ব্যবস্থা ছিল। বাড়ির আবর্জনা সরাসরি নর্দমায় না ফেলে যাতে একটি জায়গায় জমা হয়, সেজন্য বিশেষ শোষক কুপ (Soak pits)-এর ব্যবহার ছিল।
৪. গৃহনির্মাণ শৈলী ও পোড়া ইটের ব্যবহার।বাসগৃহ নির্মাণের ক্ষেত্রে সিন্ধু উপত্যকার মানুষ অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল।আর সেখানে দেখা যায়-
•ইটের একরূপতাঃবাড়ি তৈরিতে রোদে শুকানো ইট নয়, বরং এক নির্দিষ্ট অনুপাতে (4:2:1) তৈরি পোড়া ইটের (Baked Bricks)ব্যবহার করা হতো।
•কাঠামোঃ বাড়িগুলি সাধারণত একতলা বা দোতলা হতো। বাড়ির মাঝখানে একটি খোলা উঠোন থাকত এবং তাকে কেন্দ্র করে চারপাশে শোবার ঘর, রান্নাঘর ও পৃথক স্নানাগার থাকত।
•সুরক্ষা ও গোপনীয়তাঃরাস্তার দিকে বাড়ির কোনো বড় জানলা রাখা হতো না; প্রধান দরজা থাকত ভেতরের গলির দিকে। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি বাড়িতেই জলের জন্য নিজস্ব কুয়োর ব্যবস্থা ছিল।বিশিষ্ট গণ-স্থাপত্যের নিদর্শন ছিল ব্যক্তিগত বাসস্থান ছাড়াও হরপ্পা সভ্যতায় কিছু বিশাল আকৃতির রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্থাপত্যের সন্ধান মিলেছে-
ক) মহেঞ্জোদাড়োর বৃহৎ স্নানাগার (The Great Bath)।মহেঞ্জোদাড়োর সিটাডেল অংশে একটি বিশাল স্নানাগার পাওয়া গেছে। এটির দৈর্ঘ্য ৩৯ ফুট, প্রস্থ ২৩ ফুট এবং গভীরতা ছিল প্রায় ৮ ফুট।
•স্নানাগারের জল যাতে চুইয়ে বাইরে না যায়, সেজন্য ইটের গাঁথুনির ওপর **বিটুমিন বা আলকাতরার আস্তরণ** দেওয়া হয়েছিল।
•এতে নামার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সিঁড়ি ছিল এবং চারপাশ ঘিরে ছোট ছোট ঘর ছিল (সম্ভবত পোশাক পরিবর্তনের জন্য)। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবের যৌথ স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
খ) বৃহৎ শস্যাগার (The Granary)। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদাড়ো দুই জায়গাতেই বিশাল শস্যাগারের সন্ধান মিলেছে। হরপ্পার শস্যাগারটি ছিল প্রায় ১৬৯ ফুট লম্বা এবং ১৩৫ ফুট চওড়া। এটি নদীপথের কাছাকাছি তৈরি করা হয়েছিল যাতে দূরদূরান্ত থেকে শস্য এনে সহজে মজুত করা যায়। এটি ছিল সভ্যতার রাষ্ট্রীয় জরুরি তহবিলের মতো।
গ) লোথালের পোতাশ্রয় (Dockyard)।গুজরাটের লোথালে একটি কৃত্রিম পোতাশ্রয় বা ডকইয়ার্ড আবিষ্কৃত হয়েছে, যা তাদের উন্নত সামুদ্রিক বাণিজ্য ও প্রকৌশল বিদ্যার প্রমাণ দেয়। ভোগাবো নদীর সাথে খাল কেটে এটি যুক্ত করা হয়েছিল।
সিন্ধু সভ্যতার এই নিখুঁত নগর পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যার মধ্যে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা হিসেবে বড় অঞ্চল জুড়ে একই পরিমাপের ইট, সুনির্দিষ্ট রাস্তার মাপ এবং কঠোরভাবে নিয়ম মেনে নর্দমা তৈরি করা কোনো কেন্দ্রীয় পুরসভা বা সুসংগঠিত শাসন কাঠামো ছাড়া সম্ভব ছিল না।
জনস্বাস্থ্য ও উপযোগিতাবাদে দেখা যায় মিশরের মানুষ যখন ফারাওদের জন্য বিশাল পিরামিড বানাচ্ছিল, সিন্ধুর মানুষ তখন সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাত্যহিক সুবিধার দিকে নজর দিচ্ছিল।
পরিশেষে বলা যায় যে, হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনা কেবল প্রাচীন ভারতের নয়, বরং সমগ্র মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে দাঁড়িয়ে তারা যে নগর চেতনার জন্ম দিয়েছিল, তা আধুনিক যুগের নগর পরিকল্পনাবিদদেরও প্রতিনিয়ত বিস্মিত করে।
Comments
Post a Comment